১৫০ বছরেও যে প্রাণী ‘তরুণ’: আয়ারল্যান্ড উপকূলে ভেসে এল মৃত গ্রিনল্যান্ড শার্ক
বর্তমানে সমুদ্রে বিচরণ করা কিছু গ্রিনল্যান্ড শার্ক হয়তো বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের সমসাময়িক। কয়েক শতাব্দী ধরে সচল থাকা একটি ক্ষতবিক্ষত হৃদপিণ্ড এবং বয়সের সাথে অম্লান থাকা দৃষ্টিশক্তি নিয়ে এই হাঙর বার্ধক্যজনিত ক্ষয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টিকে থাকে।
আয়ারল্যান্ডের ঝড়-বিক্ষুব্ধ পশ্চিম উপকূলে প্রায়ই মৃত সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে আসে। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিলে স্লিগো কাউন্টির উপকূলে একদল গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবক এমন এক প্রাণীর দেখা পান, যা আগে কখনো এখানে আসেনি—একটি মৃত গ্রিনল্যান্ড শার্ক।
প্রায় ১০ ফুট দীর্ঘ ধুসর-বাদামি রঙের এই প্রাণীটির বয়স বিজ্ঞানীদের মতে ১৫০ বছরেরও বেশি। অর্থাৎ এর জন্ম হয়েছিল রানি ভিক্টোরিয়া এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের আমলে, যখন পালতোলা জাহাজ সমুদ্র দাপিয়ে বেড়াত এবং গাড়ির উদ্ভাবন পর্যন্ত হয়নি। তবে গ্রিনল্যান্ড শার্কের মানদণ্ডে এটি এখনো বেশ তরুণ।
আইরিশ হোয়েল অ্যান্ড ডলফিন গ্রুপের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী এমিলি ডি লুস বলেন, 'এটি খুবই দুঃখজনক। এই প্রাণীটির প্রজননক্ষম হয়ে উঠতে এবং বংশবিস্তারে অবদান রাখার পর্যায়ে পৌঁছাতে ১৫০ বছর সময় লেগেছে। হয়তো সেই সুযোগ পাওয়ার আগেই ও মারা গেল।'
সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী
গ্রিনল্যান্ড শার্ক পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী, যা প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। এদের আয়ুষ্কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গবেষকদের ধারণা এটি ৩০০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এমিলি ডি লুস বলেন, 'আমরা সবাই স্রেফ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এটি কত দীর্ঘ সময় বেঁচে ছিল এবং কী কী দেখেছে—তা ভাবলে অবাক হতে হয়।'
হাঙরটির মৃত্যু দুঃখজনক হলেও গবেষকদের কাছে এটি এক বিশাল সুযোগ। আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক-এর সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান গবেষক জেসমিন স্ট্যাভেনো ইয়েরেমেলাম হাঙরটির ব্যবচ্ছেদে অংশ নেন। তিনি বলেন, 'মৃত প্রাণীদের নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে প্রজাতিটি সম্পর্কে খুব কাছ থেকে জানা যায়। মৃত প্রাণী আমাদের জীবিত প্রাণী সম্পর্কে অনেক তথ্য দিতে পারে।'
২০০ কেজি ওজনের এই বিশাল হাঙরটিকে ল্যাবে নেওয়া ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ। আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে একটি ক্রেনের সাহায্যে এটিকে ট্রাকে তুলে পশুচিকিৎসাগারে নেওয়া হয়। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে মাস্ক, গ্লাভস এবং বিশেষ পোশাক পরে গবেষকরা পরীক্ষা শুরু করেন। স্ট্যাভেনো ইয়েরেমেলাম বলেন, 'শতবর্ষী এই প্রাণীর শরীরে প্রাচীন কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থাকতে পারে। যেহেতু আমরা জানি না হাঙরটি কেন মারা গেছে, তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন ছিল।'
গ্রিনল্যান্ড শার্কের অজানা দিক
গ্রিনল্যান্ড শার্ক মূলত উত্তর আটলান্টিক এবং গ্রিনল্যান্ড, কানাডা ও আইসল্যান্ডের শীতল পানিতে বাস করে। তাদের শরীরে থাকা উচ্চমাত্রার রাসায়নিক পদার্থ মূলত এক ধরনের 'অ্যান্টি-ফ্রিজ' বা জমাট-বিরোধী উপাদান হিসেবে কাজ করে। তবে এর একটি মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো—এই রাসায়নিকের কারণে তাদের মাংস বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
এরা খুব ধীরগতির সাঁতারু। এরা মূলত মৃত প্রাণী খেয়ে থাকে, তবে কখনো কখনো সিল মাছের মতো শিকারকেও কবজা করতে পারে।
ওশেনস নর্থের বিজ্ঞানী ব্রায়ান ডিভাইন বলেন, 'এত বড় এবং বিস্তৃত এলাকায় বিচরণ করা একটি প্রজাতি সম্পর্কে আমরা এখনো কত কম জানি, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। এদের প্রজনন ক্ষেত্র কোথায় বা কত ঘনঘন এরা বাচ্চা দেয়—তা এখনো রহস্য।' এই অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বে এদের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা-ও বিজ্ঞানীদের অজানা।
দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে গ্রিনল্যান্ড শার্কের দৃষ্টিশক্তি খুব ক্ষীণ বা এরা অন্ধ। কারণ এরা অনেকদিন বাঁচে ও এদের চোখে ছোট এক ধরণের পরজীবী আটকে থাকে। তবে ২০২৬ সালে প্রকাশিত লিলি ফগ ও তার দলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এদের চোখ ও রেটিনা আসলে অক্ষত এবং সামান্য আলোতেও দেখতে সক্ষম। লিলি ফগ বলেন, 'এদের দৃষ্টিশক্তি অনেকটা লো-লাইট ক্যামেরার মতো। এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর যে ১০০ বছর পরও এদের চোখের কোষগুলো সুস্থ থাকে।'
গবেষকদের ধারণা, গ্রিনল্যান্ড শার্কের ডিএনএ মেরামত করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এদের শরীরে ডিএনএ মেরামতের জন্য দায়ী জিনগুলো অন্য প্রাণীদের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় থাকে।
ব্যবচ্ছেদের সময় হাঙরটির ৩৪ কেজি ওজনের একটি বিশাল হৃদপিণ্ড পাওয়া গেছে। মানুষের হৃদপিণ্ড যেখানে মাত্র ৩০০ গ্রাম ওজনের হয়, সেখানে এর হৃদপিণ্ড এক বিশাল ইঞ্জিন। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ড শার্কের হৃদপিণ্ডে বার্ধক্যের ছাপ থাকলেও তা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। এই বিশেষ সহনশীলতাই এদের দীর্ঘায়ুর অন্যতম চাবিকাঠি।
জেসমিন স্ট্যাভেনো ইয়েরেমেলাম বলেন, 'এর দাঁতগুলো মৃত পশুর মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। ওপরের দাঁতগুলো সোজা ও ধারালো এবং নিচের দাঁতগুলো করাতের মতো।' পরীক্ষার সময় হাঙরটির পাকস্থলী খালি থাকলেও অন্ত্রের একটি অংশ পূর্ণ ছিল, যা থেকে বোঝা যায় এটি সম্প্রতি খাবার হজম করেছিল।
এমিলি ডি লুস জানান, প্রাণীটির একটি অণ্ডকোষ মোচড়ানো ছিল এবং প্লীহার রং কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল। তবে সামগ্রিকভাবে হাঙরটি সুস্থ ছিল। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরীক্ষার মাধ্যমে এর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, 'এটি আমাদের হিসেবে বয়স্ক মনে হলেও এর জীবনের বড় একটি অংশ সামনে পড়ে ছিল।' আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়াম প্রাণিটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা করছে, যাতে সাধারণ মানুষ রহস্যময় এই প্রজাতি সম্পর্কে জানতে পারে।
