‘সম্রাট’ ও ‘নিহারকলি’র গল্প: অসংখ্য প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতারই ছবি
গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকা 'সম্রাট' ও 'নিহারকলি' নামের দুটি হাতিকে পুনরায় দেখভালকারীদের জিম্মায় দিয়েছিল বন বিভাগ। বনবিভাগ নাকি মনে করেছিল এদের মালিক এদেরকে আর চাঁদা তোলার কাজে ব্যবহার না করবে না, কষ্ট দেবে না। কী কঠিন বিশ্বাস বনবিভাগের।
তাই অসুস্থ হাতি দুটো একটু সুস্থ হওয়ার পর গোপনে তাদের সেই অত্যাচারি মালিকের হাতেই ছেড়ে দেয়া হলো। কিন্তু মালিক সেই আগের মতোই হাতি দুটোর উপর অত্যাচার করতে থাকার খবর দেখতে পেয়ে মন্ত্রীর নির্দেশে এদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে সাফারি পার্কে। বিভিন্ন অভিযোগে দুই বছর আগে হাতি দুটি উদ্ধার করে পুনর্বাসনের জন্য গাজীপুর সাফারি পার্কে রেখেছিল বন বিভাগ।
দেখভালকারীরা যদি ভালো মানুষই হতো, তাহলে তো তারা তাদের এই পোষ্য দুজনকে নির্যাতন করতো না এবং কষ্ট দিতো না। আর হাতিকে খাওয়ানোর জন্য এবং নিজেদের খাওয়া যোগাড় করার জন্য যে এরা আবার চাঁদাবাজি করাবে, এতো পানির মতো পরিষ্কার। অমানবিক ব্যক্তির কাছে মুচলেকা নেওয়া অর্থহীন।
বনবিভাগ কেন, কার পরামর্শে এবং প্রাণী বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা না বলে এ ধরনের বাজে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তদন্ত হওয়া দরকার। আর মুচলেকা ভঙ্গকারী মাহুতের বিচার কী হলো, তাও জানা দরকার।
প্রায়ই দেখছি একশ্রেণির মানুষ পথকুকুর মারার জন্য প্রকাশ্যে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। পথকুকুরের অপরাধ তারা মানুষকে কামড়ে দিচ্ছে, জলাতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সব পথকুকুর মানুষকে কামড়ায় না বা জলাতঙ্ক ছড়ায় না। যে সব কুকুর র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, কেবল তারাই এই রোগ ছড়াতে পারে।
সরকারি উদ্যোগে বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তায় কুকুরদের জলাতঙ্কের টিকাদান কর্মসূচি চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাই কুকুর দেখলেই ধরেবেঁধে মেরে ফেলতে হবে বা তার ক্ষতি করতে হবে, এমনটা মেনে নেয়া কষ্টকর।
শুধু কুকুর কেন এই ধরনের মানুষরা বিড়ালকেও মেরে ফেলে। জাপান গার্ডেন সিটিতে কুকুরের সাথে ১০-১৫টা বিড়াল বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। ধানমন্ডি লেকে বিড়ালকে ধরে ধরে চোখ উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এরা পাখি, গুইসাপ, বেজি, বন বিড়াল, মেছোবাঘ, শিয়াল, সাপ, হাতি, ঘোড়া যাকে পাচ্ছে তাকেই হত্যা করছে। বনবিড়াল মেরে কাঁধে নিয়ে মিছিলের ছবিও দেখেছি।
এই মানসিকতার মানুষগুলোকে সাপোর্ট না করাই উচিত। এদের একমাত্র আদর্শ হত্যা করা। এরা বিকল্প কিছু ভাবতে পারে না। তাছাড়া ক্ষতির কথাই যদি ভাবি, দেখবো যে কুকুর আমাদের যা ক্ষতি করছে বা করেছে, এর চেয়েও শত শত গুণ বেশি ক্ষতি করছে আমাদের জাত ভাই মানুষ। সারাদেশে ধর্ষক, নারী ও শিশু নির্যাতনকারী, ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, খুনির আছে, যারা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মানুষের ক্ষতি করছে। তাদের ক্ষেত্রে কী বিচার হওয়া উচিত?
বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ফসলি জমি রক্ষা করা বা মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে বিষটোপ ব্যবহার করে এবং ফাঁদ পেতে গণহারে পাখি হত্যার অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেদিন ধান খেয়েছে বলে ৩০ টা বাবুই পাখির বাসা বাচ্চা ও ডিমসহ ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে এক ব্যক্তি।
চুয়াডাঙ্গার একটি গ্রামে ফসলি জমিতে বিষমিশ্রিত ধান ছিটিয়ে রাখার ফলে শালিক ও চড়ুইসহ প্রায় ৫০০ পাখি মারা গেছে। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় পাখির মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে ফাঁদ পেতে প্রায় ৪০০ শালিক পাখি শিকার ও হত্যা করেছে মানুষ।
পদ্মার চরে ও মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরে বিষটোপ দিয়ে বন্যহাঁস ও পরিযায়ী পাখি শিকার করা হয় প্রায়ই। বিষাক্ত ছাগলের মরদেহ টোপ হিসেবে রাখায় মারা যায় বিলুপ্তপ্রায় বিপন্ন শকুন।
সোনাগাজীতে কৃষকের একটি অন্তঃসত্ত্বা গাভীর মাথা গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। চট্টগ্রামে একজন প্রবাসী এক হরিণ শাবককে খাবার দিয়ে ভুলিয়ে কাছে এনে গুলি করে হত্যা করে এবং পরে মৃত হরিণের পাশে দাঁড়িয়ে সদলবলে ফটোসেশন করেছে। পুরো দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিডিও করে শেয়ারও করেছিল সেই প্রবাসী বাঙালি।
রাজধানীতে দুই মা কুকুরসহ ১৪টি বাচ্চাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়েছিল। মনিপুরি পাড়ায় বাথরুমে বন্দি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল আরেক কুকুরকে। হত্যার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল করা হয়। এদেরকে কি সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ বলে মনেহয়?
অসচেতনতা ও কঠোর শাস্তির অভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের প্রাণী ও পরিবেশবিরোধী অপরাধ ঘটে থাকে। চুয়াডাঙ্গায় ৫০০ পাখি হত্যার জন্য, ৫০০ টাকা জরিমানা হয়েছে। বন্যপ্রাণী বা পাখি হত্যার জন্য এমন শাস্তি দেয়া হচ্ছে, যা খুব লঘু। মানুষ সেজন্য এই শাস্তি নিয়ে খুব একটা বিচলিত নয়। একই অপরাধ বারবার করতেও দুইবার ভাবে না।
মানুষ তার পোষা প্রাণীর উপরেও অমানবিক আচরণ করে কখনো কখনো। ঝিনাইদহে এক ব্যক্তি প্রায় তিন মাস ধরে ময়লা মিশ্রিত বুকসমান থকথকে কাদায় বেঁধে রেখেছিল তার চারটি মহিষকে। এলাকাবাসী বলার পরেও সে মহিষগুলোকে সেইভাবেই রেখেছিল। এই খবরটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই অমানবিক অবস্থা থেকে মহিষগুলোকে উদ্ধার করেছে প্রশাসন।
মহিষকে সুস্থ রাখতে গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা কাদায় বা পানিতে থাকতে দেওয়া উচিত, তবে তা যেন পরিষ্কার এবং নিরাপদ পরিবেশে হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু মানুষ যখন জোর করে মহিষকে দীর্ঘক্ষণ বেঁধে রাখে, এবং কাদার পানি যদি দীর্ঘদিনের জমা মলমূত্র বা রাসায়নিকযুক্ত হয়, তবে মহিষের ত্বকে ইনফেকশন বা ঘা হতে পারে। এটা ভাষাহীন প্রাণীর প্রতি চরম অমানবিক আচরণ।
এক প্রবাসী একটি ছাগল দিয়ে তিন চাকার গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছে। ছাগলটির সামনে কাঁঠাল পাতা ঝুলিয়ে রেখেছে, যেন সে পাতা খাওয়ার জন্যই সেই গাড়ি টেনে নিয়ে যায়। এটা কোনো বিনোদনের বিষয় নয়, অত্যন্ত অমানবিক একটি বিষয়। বহু বছরের সঙ্গী উপকারী ঘোড়াকে বৃদ্ধ বা অসুস্থ হয়ে গেলে পথে ছেড়ে দেয়া হয় অবলীলায়, ঠিক যেভাবে অনেকে বৃদ্ধ মা-বাবাকেও ঘর থেকে বের করে দেয়।
শিশুরা তাদের আশপাশের পরিবেশ থেকে আচরণ শেখে। শিশু যদি এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠে, যেখানে পশুপাখির সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়, তখন তারাও সেই আচরণ শেখে। তারা এই নিষ্ঠুর আচরণকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয় এবং বড় হয়ে তারাও তাই করে।
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলাল বলেন, "সামাজিক রীতিনীতির কারণে প্রাণীদের প্রতি সমমর্মী একজন মানুষকে প্রকাশ্যে তার অনুভূতি ব্যক্ত করতেও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে। একটি সমাজে যদি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখা হয় তাহলে সহমর্মী কোনো ব্যক্তির সেখান থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়ানো খুব কঠিন।"
আমাদের বুঝতে হবে, একটা মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করলে তার যে কষ্ট হয়, একটা পশুরও তাই হয়। আর যে মানুষ নিরীহ পশুপাখির ওপর নৃশংস হতে পারে, তার পক্ষে পরবর্তীতে মানুষের ওপর নিষ্ঠুর হওয়া খুব কঠিন হয় না।
রাজবাড়ীতে একটি ঘোড়ার চার পা বেঁধে পায়ুপথে ও মূত্রনালিতে বাঁশের লাঠি ঢুকিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। শত্রুতা ছিলো ঘোড়ার মালিকের সঙ্গে, কিন্তু মারা যেতে হলো ঘোড়াটিকে। এই ঘোড়াটিকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই একইভাবে হত্যা করা হয়েছিল বগুড়ার কাহালুতে শিশু শ্রমিক রাসেল ও রুবেলকে এবং নারায়ণগঞ্জে শিশু সাগর বর্মণকে।
মানুষের নিষ্ঠুর আচরণের বলি হতে হয় মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের। যারা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকে, তাদের অনেকের নিষ্ঠুরতার শুরুটা হয় প্রাণীর প্রতি সহিংস আচরণের মধ্য দিয়ে। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুর সামনে পশু-পাখিদের প্রতি ভালো আচরণের উদাহরণ তৈরি করা। পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা থেকে কীভাবে বড় ধরনের সহিংসতার সৃষ্টি হতে পারে, সে সম্পর্কেও শিশুদের জানানো উচিত।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
