হরমুজে আক্রমণ বন্ধ ও টোলমুক্ত রাখতে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের আলটিমেটাম, প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার দাবি
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ বন্ধ এবং এই আন্তর্জাতিক জলপথটি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে ইরানকে আগামী শনিবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, ইরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে যে তারা জাহাজে হামলা চালাবে না এবং এই রুটে কোনো ধরনের 'টোল' বা শুল্ক আদায় করা হবে না।
শুক্রবার মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী এবং সরাসরি বার্তার মাধ্যমে তেহরানকে এই আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, তিন সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বারবার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, যা ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চলতি সপ্তাহের শুরুতে ঘোষিত 'যুদ্ধবিরতি' শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, হরমুজ প্রণালির মতো একটি সহজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ইরান ব্যর্থ হওয়ায় দেশটির সঙ্গে আরও জটিল কোনো পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
ওমানে বৈঠক ও কূটনৈতিক তৎপরতা
এই সংকট নিরসনে শনিবার মাস্কাটে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল-বুসাইদির সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগে থেকেই ওমান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের উপকূলের কাছে একটি বিকল্প দক্ষিণ চ্যানেল খুলে দেয়, যা ইরানকে ক্ষুব্ধ করে। তেহরান মনে করছে, এর ফলে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে গেছে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, ইরানের আলোচনারত প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে শাসনের ভেতরকার কট্টরপন্থীরা প্রভাব ফিরে পেতে জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে জনসম্মুখে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) এবং শীর্ষ নেতারা হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবিতে অনড় রয়েছেন।
পাল্টাপাল্টি দাবি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই শুক্রবার জানান, আরাগচির ওমান সফর মূলত সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক। তিনি বলেন, 'ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ এবং আমরা ওমানের সাথে এ বিষয়ে সহযোগিতা করছি।'
তবে পর্দার আড়ালে মার্কিন কর্মকর্তারা ভিন্ন দাবি করছেন। একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি সপ্তাহের সংঘাতের পর ইরানিরা সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছে, 'আমাদের ভুল হয়েছে, আমরা ভুল করেছি। চলুন আলোচনা চালিয়ে যাই।'
যদিও ইরান এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, তারা কেবল কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে।
ক্ষমতার লড়াই ও পরবর্তী পদক্ষেপ
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে আলোচনার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই চলছে। এক পক্ষ চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইলেও অন্য পক্ষ কট্টর অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, শনিবারের বৈঠকের পর ইরান একটি প্রকাশ্য বিবৃতি দেবে যেখানে তারা হামলা বন্ধ এবং জলপথটি টোল-মুক্ত রাখার অঙ্গীকার করবে। এক মার্কিন কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'যদি আগামীকাল (শনিবার) তাদের অবস্থান পরিষ্কার না হয়, তবে তাদের জন্য দিনটি খুব একটা সুখকর হবে না।'
পারমাণবিক চুক্তির ভবিষ্যৎ
গত তিন সপ্তাহের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আলোচনায় পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি হলেও হরমুজ সংকট পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তারা কূটনীতিকে সুযোগ দিতে চায়, কিন্তু হাতে সময় খুব কম। যদি কোনো চুক্তি সফল না হয়, তবে বিকল্প কঠোর ব্যবস্থার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করে রেখেছে হোয়াইট হাউস।
ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানে দুই দফা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের পক্ষ থেকে নতুন করে কূটনীতির ইঙ্গিত মেলায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল।
