চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতায় উদ্বেগ: প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে ন্যাটো, ইন্দো-প্যাসিফিক ৪ দেশের অঙ্গীকার
রাশিয়া ও চীন ক্রমেই আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো এবং এর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সহযোগী দেশগুলো প্রতিরক্ষা শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে ন্যাটো তার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে ইন্দো-প্যাসিফিক ফোর (আইপি-৪)-ভুক্ত চারটি দেশ—অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে।
এই আলোচনায় অংশ নেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন; জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি; নিউজিল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প বিষয়ক মন্ত্রী প্যাট কনরয়।
দুই দিনব্যাপী ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে, আইপি-৪-ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অংশ নিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি। আজ বুধবার এই সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্ক রুটে এবং আইপি-৪-ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, চীন সংক্রান্ত বিষয়সহ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিস্থিতি, উত্তর কোরিয়া বিষয়ক নীতি এবং ইরান পরিস্থিতি স্থান পেয়েছে। তারা প্রতিরক্ষা শিল্প, সাইবার স্পেস ও প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আসা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের যথাযথ মোকাবিলা করতে আইপি৪-এর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় ন্যাটো।
জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি বলেন, "ইউক্রেনে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যেমনটি দেখা গেছে, ইউরো-আটলান্টিক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা একে অপরের থেকে অবিচ্ছেদ্য। আর তাই আইপি-৪ এবং ন্যাটোর এভাবে একত্রিত হওয়া ও নিজেদের সংহতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, "ন্যাটো ও আইপি৪-এর মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।" একই সঙ্গে ন্যাটোর সঙ্গে বাস্তবমুখী সহযোগিতা আরও বাড়ানোর এবং কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
ইউরো-আটলান্টিক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যকার আন্তঃসংযুক্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্যাটোর উদ্যোগে 'আইপি-৪' সহযোগী গোষ্ঠীটি গঠিত হয়েছিল। ন্যাটো জোটের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও— ২০২২ সাল থেকে এই চার দেশকে অতিথি হিসেবে ন্যাটোর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
এর আগে মঙ্গলবার ন্যাটো সম্মেলনের 'ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম'-এর উদ্বোধনী ভাষণে রুটে বলেন, রাশিয়া তাদের জাতীয় বাজেটের অর্ধেকই ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করছে এবং দেশটি চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমানভাবে একযোগে কাজ করছে।
তিনি বলেন, চীন কোনো ধরনের "স্বচ্ছতা ছাড়াই" তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকীকরণ এবং পারমাণবিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ করে চলেছে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাড়াচ্ছে ও রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। রুটে সতর্ক করে বলেন, এটি "আমাদের সবার জন্যই উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।" এই পরিস্থিতিতে তিনি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে বেইজিং নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করলেও, রাশিয়ার সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী (ডুয়াল-ইউজ) প্রযুক্তি এবং সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে। এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে মাইক্রো-ইলেক্ট্রনিক্স, উন্নত মেশিন টুলস, ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল।
চীন ও রাশিয়া নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়াও পরিচালনা করে আসছে। এর মধ্যে গত মাসে বোমারু বিমানের যৌথ টহল এবং চলতি সপ্তাহে পূর্বচীনের উপকূলে শুরু হওয়া নৌ মহড়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত সপ্তাহে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে রাশিয়ার একটি গোপন নথির বরাত দিয়ে বলা হয়, গত নভেম্বর মাসে বেইজিংয়ে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) একটি স্থাপনায়—যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়ায় অংশ নিয়েছিল রাশিয়ার একটি সামরিক প্রতিনিধি দল। ওই প্রশিক্ষণের মূল ফোকাস ছিল রেডিওলজিক্যাল, রাসায়নিক এবং জৈবিক যুদ্ধ কৌশল। তবে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে চীন।
এদিকে, বেইজিং তাদের সামরিক সক্ষমতা জোরদার করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে। গত সোমবার চীন জানায় যে, তারা একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ডামি ওয়ারহেডসহ 'কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র' পরীক্ষা করেছে। ১৯৮২ সালের পর সাবমেরিন থেকে পিএলএ-এর এটিই প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বলে জানা গেছে।
ন্যাটোর মহাসচিব রুটে বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা প্রমাণ করে চীনকে নিয়ে ন্যাটোর উদাসীন থাকার কোনো সুযোগ নেই। সোমবার তুরস্কের রাজধানীতে শীর্ষ সম্মেলন শুরুর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যা ঘটছে, তা আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।" এ ছাড়া তিনি চীন, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের মূল সহায়তাকারী হিসেবে বর্ণনা করেন।
২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয়– সদস্য দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ন্যাটো। ফলে এবারের শীর্ষ সম্মেলনের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে শিল্প খাতের সহযোগিতা। এর পাশাপাশি আইপি-৪-ভুক্ত দেশগুলো ন্যাটোর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ছিল দক্ষিণ কোরিয়া।
আইপি-৪ বৈঠকের আগে ন্যাটোর মহাসচিব রুটের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে একটি মৌলিক দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় চুক্তি সইয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রেসিডেন্ট লি বলেন, এই ধরনের চুক্তি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষাখাতের কোম্পানিগুলোর জন্য ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের আরও বিস্তৃত করার একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লি লিখেছেন, "আমি আমাদের বিশ্বমানের প্রযুক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি বড় মঞ্চে তাদের দক্ষতা প্রদর্শনের এবং প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করার অপেক্ষায় রয়েছি।"
আঙ্কারায় দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিচালক উই সুং-ল্যাক বলেন, এই চুক্তির অর্থ হলো "বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের বাজারে প্রবেশের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা।" এর মাধ্যমে ন্যাটোর যৌথ ক্রয় বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে, যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ১৫ ট্রিলিয়ন ওন (৯৯০ কোটি মার্কিন ডলার)।
আইপি-৪ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট লি জানান, ইউরোপ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশীদারদের নিজস্ব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্প, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। এটি যৌথ নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে আরও সুদৃঢ় করবে উল্লেখ করে তিনি নিজের পোস্টে সতর্ক করেন যে, কোনো দেশের পক্ষেই এককভাবে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, "বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এটি এতটাই জটিল যে, কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে এই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।"
