বিশ্ব ‘জঙ্গলের শাসনে’ ফেরার ঝুঁকিতে, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার শক্তি: শি জিনপিং
বেইজিংয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের নেতা শি জিনপিং। আজ বুধবার (২০ মে) বৈঠকের শুরুতেই পুতিনকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছেন, বিশ্ব আজ 'জঙ্গলের শাসনে' (জোর যার মুল্লুক তার) ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আতিথেয়তা দেওয়ার মাত্র কয়েকদিন পরেই পুতিনের সাথে এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে তিনি চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি বড় শক্তি হিসেবে অভিহিত করেন।
চীনের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরুর আগে রুশ প্রেসিডেন্টকে জাঁকজমকপূর্ণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থলে দুই নেতার উপস্থিতিতে সামরিক ব্যান্ড দল রাশিয়া ও চীনের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে। এসময় চীনা সেনারা পুতিনকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। দুই নেতা গ্রেট হলে প্রবেশের সময় শিশুরা দুই দেশের পতাকা নেড়ে চীনা ভাষায় "স্বাগতম, স্বাগতম!" বলে চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করে।
এই দৃশ্য গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের বৈঠকের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির দেশের নেতারা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে— ইরান সংঘাত এবং তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর
শি ও পুতিনের মধ্যকার আলোচনা প্রথমে অল্প কয়েকজন প্রতিনিধি নিয়ে একান্ত বৈঠকের মাধ্যমে শুরু হয়, যেখানে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন তারা। এরপর প্রতিনিধি দলসহ দুই নেতা একটি "বিস্তৃত বিন্যাসের" (ওয়াইড ফরম্যাট) বৈঠক করেন, যা স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় শেষ হয়।
বৈঠক শেষে শি ও পুতিন প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদসহ বিভিন্ন খাতের বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেন। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নথিপত্রগুলোর মধ্যে ২৫ বছর আগে প্রথম স্বাক্ষরিত "চীন-রাশিয়া সুপ্রতিবেশীসুলভ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি"-র মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর দেওয়া বক্তব্যে শি বলেন, বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্ক এখন "ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্বের সর্বোচ্চ স্তরে" রয়েছে। একই সাথে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে "সব ধরনের একতরফা আধিপত্যবাদ ও উৎপীড়নের" বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য উভয় দেশের প্রতি আহ্বান জানান।
শি জিনপিংয়ের এই বক্তব্য তাঁর আগের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন যে বিশ্ব আজ 'জঙ্গলের শাসনে' ফিরে যাওয়ার বিপদে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি আরও বলেন যে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বৈরিতা বা যুদ্ধ বাড়ানো "অনভিপ্রেত" এবং সেখানে একটি "ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি"।
নিজ বক্তব্যের শুরুতেই পুতিন দুই দেশের সম্পর্ককে "নজিরবিহীন উচ্চতায়" রয়েছে বলে অভিহিত করেন এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও মস্কো চীনের জন্য "নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী" হিসেবে থাকবে বলে উল্লেখ করেন। পুতিন আগামী বছর শি জিনপিংকে রাশিয়া সফরের আমন্ত্রণও জানান।
ঘরোয়া চা চক্র
আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর শি জিনপিংয়ের পুতিনকে নিয়ে 'ঝংনানহাই'-এ চা চক্রে মিলিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা একসময়ের রাজকীয় উদ্যান ছিল এবং বর্তমানে এটি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদর দফতর। ২০২৪ সালের মে মাসে যখন চীনা নেতা পুতিনকে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন, তখনও তাঁরা একইভাবে ঘরোয়া পরিবেশে আড্ডা দিয়েছিলেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই, যিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুতিন বেইজিংয়ে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সাথে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ধুঁকতে থাকা রুশ অর্থনীতির জন্য পুতিনের আলোচনার এজেন্ডায় পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ শীর্ষে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীন বর্তমানে মস্কোর তেল রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই কিনে থাকে।
ট্রাম্পের সফরের সাথে তুলনা ও বৈশ্বিক কূটনীতি
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের বিপরীতে পুতিন ও শি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক গভীর ও উষ্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যেখানে তাঁরা একে অপরকে "প্রিয়" এবং "পুরোনো বন্ধু" হিসেবে সম্বোধন করেন। বুধবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি; পুতিন এই সম্পর্ক প্রকাশ করতে একটি চীনা প্রবাদের উল্লেখ করে বলেন, "এমনকি যদি আমরা একদিনও একে অপরকে না দেখি, তবে মনে হয় যেন তিনটি শরৎ পার হয়ে গেছে।"
বিশ্বনেতাদের সাথে শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পরিবেশ এবং ধরন দেখে সাধারণত সেই অতিথির প্রতি চীনা প্রেসিডেন্টের শ্রদ্ধার মাত্রা পরিমাপ করা হয়। ট্রাম্পের সফরের পরপরই পুতিনের সাথে এই বৈঠকের দৃশ্যমান দিক এবং এর ফলাফলগুলো তাই আন্তর্জাতিক মহলে বাড়তি নজর কাড়ছে।
পুতিনের এই সম্মেলন ট্রাম্পের সফরের সাথে কতটা তুলনীয়—রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, "সব সময় তুলনা করা সহজ নয়, কারণ সব কিছু তো আর উপরে প্রকাশ পায় না। আসল গুরুত্ব নিহিত থাকে আলোচনার গভীরতায়, আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বরে নয়।"
শি যখন পুতিনকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কিনবে এবং গত বছর কুয়ালালামপুরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এই বিবৃতির মাধ্যমে বেইজিং বোয়িং ক্রয়ের বিষয়টি প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করল, যার ইঙ্গিত ট্রাম্প গত সপ্তাহে দিয়েছিলেন।
রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরে চীনে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া-প্যাসিফিক কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যকার সম্ভাব্য বৈঠকের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি পেসকভ।
