ট্রাম্পের সফরের পর বেইজিংয়ে ‘চা-কূটনীতি’তে শি-পুতিন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলনে বসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার (২০ মে) বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠকের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে 'দুই পুরোনো বন্ধু'র একান্ত চা-চক্র।
ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পরপরই পুতিনের এই আগমনকে বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই বিশ্বনেতার এই সফরের ধরন, আতিথেয়তা এবং ফলাফল নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সন্ধ্যায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন পৌঁছেছেন ভ্লাদিমির পুতিন। তার এই সফরের মূল লক্ষ্য, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে আলোচনা করা। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার প্রেক্ষাপটে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পুতিনের দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠক। কাকতালীয়ভাবে, এই সফরটি ২০০১ সালের ঐতিহাসিক 'গুড-নেইবারলিনেস অ্যান্ড ফ্রেন্ডলি কোঅপারেশন' (সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা) চুক্তির ২৫তম বার্ষিকীর সময়েই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কয়েক দশকের আদর্শিক বৈরিতা এবং পারস্পরিক সন্দেহের অবসানের পর এই চুক্তির মাধ্যমেই রাশিয়া ও চীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়েছিল।
শি জিনপিং সাধারণত চীনে আগত রাষ্ট্রপ্রধানদের আপ্যায়নে চায়ের আয়োজন করেন। তবে এই আয়োজনের ধরন দেখে বোঝা যায়, সফরকারী নেতার প্রতি শির ব্যক্তিগত সম্মান ও গুরুত্ব কতটুকু। ২০২৪ সালের মে মাসে যখন পুতিন বেইজিং সফর করেছিলেন, তখন তারা দুজনেই টাই খুলে অত্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে ঝংগানহাই-এর একটি বাগানে বসে চা পান ও গল্প করেছিলেন। এর বিপরীতে, গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে শির চা-চক্র বা 'টেম্পল অফ হেভেন' ভ্রমণ ছিল অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং আনুষ্ঠানিক।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক গ্রায়েম স্মিথ বলেন, 'বেইজিং এই পুরো পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করছে। তারা এখন বিশ্বজুড়ে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পছন্দ করছে এবং নিজ দেশের মানুষের কাছে চীনের এই শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে বড় করে তুলে ধরছে।'
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের আড়ম্বরের প্রতি ঝোঁক এবং পুতিনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে শি জিনপিং নিজের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল সাজাচ্ছেন।
রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরস্পরবিরোধী দুই পরাশক্তির নেতার পরপর বেইজিং সফরকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এটি বর্তমানের খণ্ডিত বিশ্বব্যবস্থায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও মর্যাদারই স্বীকৃতি।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে পৌঁছালে পুতিনকে স্বাগত জানান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং দুই দেশের জাতীয় পতাকা নেড়ে পুতিনকে অভিবাদন জানায় একদল চীনা তরুণ-তরুণী।
উচ্চ প্রত্যাশা
পুতিন শিকে 'প্রিয় বন্ধু' এবং শি পুতিনকে 'পুরানো বন্ধু' হিসেবে সম্বোধন করেন। গত বছরের মন্দার পর দুই দেশের বাণিজ্যে যখন নতুন করে গতি ফিরছে, ঠিক তখনই পুতিন বেইজিং পৌঁছালেন।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দুই দেশের বাণিজ্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.১ শতাংশ বেড়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১.৬৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (২৪০ বিলিয়ন ডলার), যা ২০২৪ সালের রেকর্ডের তুলনায় ৬.৫ শতাংশ কম এবং গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম পতন।
পুতিন স্বীকার করেছেন যে বাণিজ্যের এই নিম্নমুখী ধারা পরিবর্তন করা জরুরি। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার অর্থনীতি চাপের মুখে থাকায় মস্কোর জন্য চীন এখন একটি 'অর্থনৈতিক লাইফলাইন'। তার এই সফরে সঙ্গে রয়েছেন উপ-প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং বড় বড় ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা।
এদিকে, পুতিনের এই সফর নিয়ে ক্রেমলিন 'বড় ধরনের প্রত্যাশা' ব্যক্ত করেছে। আলোচনার পাশাপাশি থাকবে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান এবং রাজকীয় ভোজসভা। এরপর দুই নেতা ঘরোয়া পরিবেশে চায়ের আড্ডায় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে কথা বলবেন। ক্রেমলিনের মতে, সফরে প্রায় ৪০টি নথি সই হতে পারে এবং দুই দেশের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে একটি ৪৭ পৃষ্ঠার যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হবে।
ক্রেমলিনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুতিন ও শি একটি 'বহু-মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা' এবং 'নতুন ধরণের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক' গড়ার লক্ষ্যে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করবেন। এছাড়া, রাশিয়া থেকে উত্তর চীন পর্যন্ত প্রস্তাবিত 'পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২' গ্যাস পাইপলাইন নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা দেখছেন শিল্প বিশেষজ্ঞরা।
ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে বেইজিং ও মস্কোর মধ্যকার 'সীমাহীন' অংশীদারত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে। ইরান সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি উৎস হিসেবে রাশিয়ার পাইপলাইন চুক্তির যৌক্তিকতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে বেইজিং হয়তো একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে তাদের সরবরাহ বহুমুখী করার কৌশলেই অটল থাকতে চাইবে।
