শি জিনপিংকে ‘বন্ধু’ বলার পরও খালি হাতে চীন ছাড়তে হলো ট্রাম্পকে
চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও সয়াবিন ও বোয়িং বিমান কিনবে—এমন একটি অস্পষ্ট সমঝোতা হয়েছে বেইজিংয়ে। এ ছাড়া ইরান, হরমুজ প্রণালি খোলা এবং ফেন্টানাইল তৈরির রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ করার মতো কয়েকটি বিষয়ে সামান্য আলোচনা হয়েছে।
কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের সম্মেলন শেষে শুক্রবার যখন বেইজিং ছাড়ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তখন দেখানোর মতো বড় কোনো চুক্তি তার হাতে ছিল না।
কয়েক মাসের প্রস্তুতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের ব্যস্ততার কারণে এই সম্মেলন এমনিতেই পিছিয়েছিল। অবশেষে সম্মেলন হলেও মধ্যপ্রাচ্য, বাণিজ্য, তাইওয়ান, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো ইস্যুগুলোতে প্রকাশ্যে কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। অথচ এই ইস্যুগুলোই বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যকার উত্তেজনার মূল কারণ।
এসব ইস্যু নিয়ে আলোচনার বদলে ট্রাম্পকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কূটনীতিতে মেতে উঠতে দেখা গেছে। তিনি চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব গড়ার দিকেই বেশি জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের পুরো মনোযোগ ছিল নিজের দেশের কৌশলগত এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার দিকে।
বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে নৈশভোজে ট্রাম্প শি জিনপিংকে 'আমার বন্ধু' বলে সম্বোধন করেন। শুক্রবার ক্যামেরার সামনে বসে তিনি বলেন, শি জিনপিং 'সত্যিই একজন বন্ধু হয়ে উঠেছেন'।
কিন্তু শি জিনপিংও কি ট্রাম্পকে বন্ধু মনে করেন? সম্মেলনের এক ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'উভয় পক্ষই বড় ইস্যুগুলোতে নিজেদের মতবিনিময় করেছে।'
ট্রাম্প বেইজিংয়ের এই সম্মেলনকে 'বিশাল সাফল্য' হিসেবে দাবি করেছেন এবং চীনের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়টি বারবার তুলে ধরেছেন।
তবে শি জিনপিংয়ের দিক থেকে এমন কোনো উৎসাহ দেখা যায়নি। তার সংযত কণ্ঠস্বর এবং বড় কোনো চুক্তির অভাব প্রমাণ করে যে বন্ধুত্বের এই অনুভূতি একতরফা।
নিউ ইয়র্কের এশিয়া সোসাইটির ইউএস-চায়না রিলেশন্স সেন্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরভিল শেল এই সম্মেলনকে 'অসার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী' বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা দেখলাম ট্রাম্প প্রকাশ্যেই দিবাস্বপ্ন দেখছেন।'
এই সফর ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির ঝুঁকিগুলোকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প মনে করেন, তিনি নিজের ব্যক্তিগত আকর্ষণ ও ইচ্ছাশক্তি দিয়েই বিশ্বের সব সমস্যার সমাধান এবং আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু এই সপ্তাহে তিনি এমন এক নেতার (শি) মুখোমুখি হয়েছিলেন, যিনি ট্রাম্পের প্রশংসাপ্রাপ্তির দুর্বলতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানেন এবং একে কাজে লাগানোর কৌশলও তার জানা আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্মেলনে একদিকে বিশ্বমঞ্চে চীনের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অগোছালো পররাষ্ট্রনীতির চিত্রও দেখা গেছে।
ট্রাম্পের 'অস্বস্তিকর' প্রশংসা
এই সম্মেলনটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি স্থিতিশীল সম্পর্কের সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প যেসব সীমিত সাফল্যের কথা বলেছেন, চীন তার খুব কমই নিশ্চিত করেছে। উল্টো শি জিনপিং তাইওয়ান ইস্যুতে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত রসায়ন গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে চীনের মতো কর্তৃত্ববাদী দেশের ক্ষেত্রে।
১৯৯০-এর দশকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এশিয়া বিশেষজ্ঞ সুসান এল শির্ক জানান, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন চীনের তৎকালীন নেতা জিয়াং জেমিনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন।
তবে শি জিনপিংয়ের প্রতি ট্রাম্পের মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার ছিল বলে মনে করেন সুসান। শি জিনপিং যখন অনেক সংযত ভাষা ব্যবহার করছিলেন, ট্রাম্প তখন রীতিমতো তোষামোদে মেতেছিলেন।
সুসানের মতে, ট্রাম্পের এমন আচরণ অনেক সময় 'অস্বস্তিকর' ছিল। উদাহরণস্বরূপ, সম্মেলনের ফাঁকে ফক্স নিউজের শন হ্যানিটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, শি জিনপিং 'লম্বা, অনেক লম্বা'। এরপর তিনি জাতিগত 'স্টেরিওটাইপিং' করে বলেন, 'বিশেষ করে এই দেশের জন্য (তিনি লম্বা), কারণ এরা একটু খাটো প্রকৃতির হয়।'
ব্যক্তিত্বনির্ভর কূটনীতির সীমাবদ্ধতা
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিত্বের ক্ষমতার যে একটা সীমা আছে, তা ট্রাম্প ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন।
প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে 'প্রেমে পড়ার' দাবি করার পরও তিনি দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করাতে পারেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক ডজন ফোনালাপ এবং আলাস্কায় শীর্ষ সম্মেলনের পরও তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন কী ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, 'আমি মনে করি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো সম্পর্ক। সম্পর্কই সবকিছু।'
চীনও এই সফরের ব্যক্তিগত দিকটির প্রশংসা করেছে। সম্মেলনের পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে 'রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতিই হলো পথপ্রদর্শক'। তিনি জানান, ট্রাম্প ও শি জিনপিং প্রায় নয় ঘণ্টা একসঙ্গে কাটিয়েছেন এবং 'উত্থান-পতনের পর একটি সামগ্রিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।'
তবে চীন এই বৈঠকে অনেক বড় এজেন্ডা নিয়ে এসেছিল। শি জিনপিং তাইওয়ান নিয়ে সংঘাতের বিষয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করলেও, ট্রাম্প এ বিষয়ে চুপ ছিলেন। বেইজিং থেকে এয়ারফোর্স ওয়ান উড্ডয়নের পর তিনি এ নিয়ে কথা বলেন।
এ ছাড়া ট্রাম্প যেসব বড় অর্জনের কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করেছিলেন, যেমন—চীন ৭৫০টি 'বিশাল ও সুন্দর' বোয়িং বিমান কিনছে—এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শনিবার চীন জানায়, তারা কিছু বিমান কিনবে, তবে বোয়িং কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
পুতিনের সঙ্গে বন্ধুত্বের পার্থক্য
ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের এই অগোছালো সম্পর্কের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রে। শি ও পুতিনের সম্মেলনগুলোতে বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণতা দেখা গেছে। ২০১৮ সালে তারা একসঙ্গে প্যানকেক বানিয়েছিলেন এবং ভদকা পান করেছিলেন। তাদের বৈঠকে প্রায়ই যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। যেমন, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ঠিক আগে তারা ঘোষণা করেছিলেন যে দুই দেশের বন্ধুত্বের কোনো 'সীমা নেই'।
ক্রেমলিন শনিবার জানিয়েছে, পুতিন আগামী সপ্তাহে চীন সফর করবেন। এই ঘোষণা এটিই প্রমাণ করে যে শি এখনো রাশিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখেন এবং বাণিজ্য ও প্রযুক্তি দিয়ে তাদের যুদ্ধে সহায়তা করছেন। ওয়াশিংটনের অনেকেই এই সম্পর্ককে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেন।
আগামী নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের সম্মেলনে এবং ডিসেম্বরে মিয়ামির কাছে ট্রাম্পের ডোরাল গলফ রিসোর্টে জি-২০ সম্মেলনে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের আবার দেখা হতে পারে। ট্রাম্প এ-ও জানিয়েছেন, শি জিনপিং আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। এর মানে হলো, চীনের সঙ্গে ট্রাম্প যে উচ্চপর্যায়ের কূটনীতি শুরু করেছেন, তা হয়তো কেবল শুরু।
তবে এই বৈঠকগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন বিশ্লেষকেরা। এশিয়া সোসাইটির বিশেষজ্ঞ অরভিল শেল সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছাড় দেওয়ার অতীত ইতিহাস শি জিনপিংয়ের নেই।
শেল বলেন, 'যদি এই সম্মেলনের বন্ধুত্বের ফলে কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি হয়, তবেই আমরা একে পরিবর্তনের শুরু বলতে পারি। কিন্তু এমন কিছু এখনো ঘটেনি।'
