৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি ছাড়ল ৩ সুপারট্যাঙ্কার
পারস্য উপসাগরে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে আটকে থাকার পর, এশিয়ার বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া তিনটি সুপারট্যাঙ্কার আজ বুধবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। একই সময়ে অন্য আরেকটি খালি ট্যাঙ্কার সেখানে প্রবেশ করছে বলে এলএসইজি এবং কেপলার-এর জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্যে দেখা গেছে।
ইরান জাহাজগুলোকে যে বিশেষ ট্রানজিট রুট ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে, তা অনুসরণ করে চলতি মাসে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া অল্প কয়েকটি সুপারট্যাঙ্কারের মধ্যে এই জাহাজগুলো অন্যতম।
সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুটি চীনা ট্যাঙ্কার চলে যাওয়ার পর—কুয়েতের অপরিশোধিত তেল বোঝাই করা দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকাবাহী ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) 'ইউনিভার্সাল উইনার' প্রণালিটি অতিক্রম করছিল। গত ৪ মার্চ এটিতে ২০ লাখ ব্যারেল তেল লোড করা হয়েছিল। কেপলারের তথ্য বলছে, ট্যাঙ্কারটি দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান বন্দরের দিকে যাচ্ছে, যেখানে দেশটির বৃহত্তম শোধনাগার 'এসকে এনার্জি' অবস্থিত। আগামী ৯ জুন সেখানে এই তেল খালাস করার কথা রয়েছে।
এসকে এনার্জি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ট্যাঙ্কারের মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এইচএমএম-এর মুখপাত্রের সাথে মন্তব্যের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স।
জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি
যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ যাতায়াত করত। বর্তমানে এই অচলাবস্থার কারণে শত শত জাহাজে প্রায় ২০ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন।
জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্যের ওপর রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি জাহাজ উপসাগরে প্রবেশ করছে এবং বের হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মূলত মালবাহী জাহাজ এবং রাসায়নিক ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম (এলপিজি) ট্যাঙ্কারের মতো অন্যান্য নৌযান। মোট পরিমাণের তুলনায় অপরিশোধিত তেলের বড় ট্যাঙ্কারের সংখ্যা এখনও খুবই কম।
কেপলার এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স বিশেষজ্ঞ 'সিনম্যাক্স'-এর স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ছোট মালবাহী জাহাজ এবং উপসাগরে প্রবেশ করা একটি কেমিক্যাল ট্যাঙ্কারসহ মাত্র ১০টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন 'জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার' গত মঙ্গলবার এক নোটে জানিয়েছে, "এই এলাকায় জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলোর ওপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, এখানকার নৌ-পরিচালন পরিবেশ এখনও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।" নোটে আরও বলা হয়, "গত ৪৮ ঘণ্টায় ইরানি ইউনিটগুলোর পক্ষ থেকে আগ্রাসী আহ্বান এবং কঠোর পদক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ করা গেছে।"
বুধবার জাহাজ শিল্পের অ্যাসোসিয়েশনগুলো এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে ইচ্ছুক জাহাজগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। সেখানে একাধিক নৌ-চলাচল ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে হামলার ঝুঁকি, ড্রোন ও মাইনের হুমকি এবং সেই সাথে অপ্রত্যাশিত ট্রাফিক বা যানজট ও "হ্রাসপ্রাপ্ত সামরিক তদারকি"।
এসব সংগঠন তাদের নির্দেশনায় সতর্ক করে বলেছে, "শত শত জাহাজ এখনও হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না। যদি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক যাতায়াতের উপযোগী হয়েও ওঠে, তবে এই প্রণালির ভেতরে একসাথে এত সব জাহাজের চলাচল একটি বড় ধরনের নৌ-চলাচল ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।"
