ধারণার চেয়েও দ্রুত ছড়াতে পারে ইবোলার প্রাদুর্ভাব, সতর্ক করল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ধারণার চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিনিধি।
ডব্লিউএইচও–এর প্রতিনিধি ডা. অ্যান আনসিয়া বিবিসিকে বলেন, যত বেশি তদন্ত করা হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে সংক্রমণ অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে, প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ইতুরি প্রদেশের বাসিন্দারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ পর্যন্ত ইবোলায় ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত কঙ্গোতে ৫১৩ জনেরও বেশি মানুষ ইবোলায় আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। প্রতিবেশী উগান্ডায়ও একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক এমআরসি সেন্টার ফর গ্লোবাল ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যানালাইসিস সোমবার প্রকাশিত এক মডেলিং প্রতিবেদনে জানিয়েছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংক্রমণ এখনও শনাক্তের বাইরে রয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাব সরকারি হিসাবের চেয়েও 'অনেক বড়' এবং এর প্রকৃত ব্যাপ্তি এখনও অনিশ্চিত।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা 'বিগবয়' নামের এক ব্যক্তি বলেন, মানুষ 'ভীষণ আতঙ্কিত' এবং নিজেদের সুরক্ষায় যা সম্ভব তা করছে।
তিনি বলেন, স্থানীয়রা পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধোয়ার মতো সতর্কতা অবলম্বন করছেন। তবে ফেস মাস্কের মতো সুরক্ষা সামগ্রী পাওয়া গেলে ভালো হতো।
ইতুরির আরেক বাসিন্দা আলফ্রেড গিজা বলেন, মানুষ পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন এবং নিজেদের সুরক্ষায় ফেস মাস্ক পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
রেড ক্রস সতর্ক করে বলেছে, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে, জনগণ পর্যাপ্ত তথ্য না জানলে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ইবোলা দ্রুত ভয়াবহ আকার নিতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব লক্ষণই দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার সন্ধ্যায় এক বৈঠক করেন কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স সিসেকেদি। মঙ্গলবার তিনি নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
গত সপ্তাহে ডব্লিউএইচও প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস এই প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, মহামারির বিস্তার ও গতি নিয়ে তিনি 'গভীরভাবে উদ্বিগ্ন'।
ধারণা করা হচ্ছে, গত ২৪ এপ্রিল প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে।
বর্তমানে সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী ইবোলা ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টের কোনো টিকা নেই। তবে অন্য ওষুধ এটা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে কি না, তা পর্যালোচনা করছে ডব্লিউএইচও।
বিবিসি নিউজডেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. আনসিয়া বলেন, ইতুরি প্রদেশ 'অত্যন্ত অনিরাপদ এলাকা' এবং সেখানে মানুষের চলাচল অনেক বেশি। ফলে রোগটি সম্পর্কে তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, 'আমরা যত বেশি তদন্ত করছি, ততই বুঝতে পারছি সংক্রমণ সীমান্ত পেরিয়ে এবং অন্যান্য প্রদেশেও কিছুটা ছড়িয়ে পড়েছে।'
তার মতে, প্রাদুর্ভাব ইতোমধ্যে সাউথ কিভু প্রদেশেও ছড়িয়েছে। অঞ্চলটি বহু বছর ধরে মানবিক সংকটে ভুগছে।
পূর্ব কঙ্গোর সবচেয়ে বড় শহর গোমাতেও একজন সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন। প্রায় আট লাখ ৫০ হাজার মানুষের এই শহরটি রুয়ান্ডা-সমর্থিত বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ডা. আনসিয়া বলেন, কয়েকটি প্রদেশে উচ্চমাত্রার অনিরাপত্তার কারণে মানুষ ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করছে, যা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আফ্রিকার কয়েকটি দেশ সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুত রাখাসহ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রতিবেশী রুয়ান্ডা কঙ্গোর সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করেছে। উগান্ডা জনগণকে আলিঙ্গন ও করমর্দন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
মার্কিন নাগরিক এবং মিশনারি চিকিৎসক পিটার স্ট্যাফোর্ড বলে ধারণা করা এক ব্যক্তিকে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর কঙ্গো থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জার্মানির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিবিসিকে জানিয়েছে, চিকিৎসার জন্য এক মার্কিন নাগরিককে দেশটিতে নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, সংক্রমণের সংস্পর্শে আসা আরও অন্তত ছয় মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নিতে কাজ করছে তারা।
ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ডব্লিউএইচও ও অন্যান্য সংস্থা সরকার ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কাজ করছে। একই সঙ্গে বাসিন্দাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা মেনে চলা এবং উপসর্গ দেখা দিলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
