উপসাগরীয় দেশগুলোর 'অনুরোধে' ইরানে নতুন হামলা স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের
উপসাগরীয় দেশগুলোর 'অনুরোধে' মঙ্গলবার ইরানে একটি পরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার জন্য 'গুরুতর আলোচনা চলছে' বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের 'অনুরোধে' তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, তাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি সম্পন্ন হবে যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে 'অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য' বলে বিবেচিত হবে। তিনি আবারও স্পষ্ট করে বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হবে যে 'ইরানের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না'।
তবে ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যদি শেষ পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য সমঝোতা না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র 'যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর পূর্ণাঙ্গ ও বড় ধরনের হামলা' চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন যেন আবারও কোনো 'কৌশলগত ভুল বা ভুল হিসাব' না করে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প একে একটি 'ইতিবাচক অগ্রগতি' হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, 'এর আগেও আমরা ভেবেছিলাম চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তবে এবারের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। যদি বোমাবর্ষণ না করেই আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারি, তবে আমি খুব খুশি হব।'
গত এপ্রিল থেকে আলোচনার সুবিধার্থে ঘোষিত একটি যুদ্ধবিরতি ছোটোখাটো কিছু সংঘর্ষ সত্ত্বেও মোটামুটি বজায় রয়েছে। তবে ইরান এখনো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এই জলপথটি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, কারণ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে, তেহরানকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ বহাল রেখেছে।
সোমবার রাতে ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি বক্তব্য প্রকাশ করেছে। সেখানে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এমন সব নতুন ফ্রন্ট খোলা হবে যেখানে শত্রুরা অত্যন্ত দুর্বল এবং তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের বার্তার আদান-প্রদান চলছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো এর আগে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে কোনো সুনির্দিষ্ট ছাড় দিতে রাজি হয়নি। অথচ গত রোববারও ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, 'ইরানের জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে, তারা যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয় তবে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।'
ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া শান্তি প্রস্তাবের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— অবিলম্বে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা (লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলাসহ), মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না করার নিশ্চয়তা। এছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়েছে তেহরান।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পাঁচটি শর্ত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি হলো, ইরান কেবল একটি পারমাণবিক কেন্দ্র চালু রাখতে পারবে এবং তাদের হাতে থাকা সব উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
তবে ট্রাম্প শুক্রবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখে তবে তিনি তা মেনে নিতে পারেন। এর মাধ্যমে ইরানকে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সরে আসার সংকেত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক ঘোষণা এমন এক সময়ে এল যখন যুক্তরাষ্ট্রে তার জনপ্রিয়তায় বড় ধরণের ধস নেমেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, খোদ আমেরিকার ভেতরেই এই যুদ্ধ দিন দিন জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।
গত সোমবার প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস/সিয়েনা'র এক জরিপ অনুযায়ী, ৬৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এছাড়া, মাত্র ৩৭ শতাংশ ভোটার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ, অর্থনীতি এবং অভিবাসন ইস্যুতে জনসাধারণের এমন ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। এর জবাবে তেহরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে আবারও হামলা চালায় তবে তেহরান পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে তাদের বিমানবন্দর, পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা এবং পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে।
