যেকারণে ট্রাম্প-শি বৈঠক নিয়ে উদ্বেগে মধ্যম শক্তির দেশগুলো
আগামী সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই বৈঠককে ঘিরে এশিয়ার অনেক মধ্যম শক্তির দেশের মধ্যেই বেশ উদ্বেগ কাজ করছে।
তাদের শঙ্কা হলো—চীন থেকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লোভে, এশিয়ায় নিজেদের সামরিক প্রতিশ্রুতিগুলোর সঙ্গে হয়তো আপস করে বসতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শিগগিরই দক্ষিণ কোরিয়ার তৈরি ট্যাংকের উৎপাদনের কাজ শুরু হবে পোল্যান্ডে। এদিকে জাপান থেকে নতুন যুদ্ধজাহাজ কেনার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে অস্ট্রেলিয়া।
কানাডা ভারতকে ইউরেনিয়াম সরবরাহ করার চুক্তি করেছে, যেখানে আবার ভারত ভিয়েতনামে ক্রুজ মিসাইল পাঠাবে। এর মধ্যেই ব্রাজিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য সামরিক পরিবহন বিমান তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হওয়া এই প্রতিরক্ষা আর বাণিজ্য চুক্তির বহর প্রমাণ করে যে—মধ্যম বা মাঝারি ধরনের শক্তির দেশগুলো একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে।
কারণ একদিকে যেমন ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বে তেলের প্রবল হাহাকার তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি শি ও ট্রাম্পের মধ্যে অতি-প্রতীক্ষিত ওই শীর্ষ সম্মেলন দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই কোনো পরাশক্তির দিকে না তাকিয়ে দেশগুলো এখন নিজেদের রক্ষা করতেই ব্যস্ত।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান বিশ্বে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র—কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না।অতীতে বাণিজ্য হোক বা সামরিক চুক্তি, ট্রাম্প এবং শি উভয়ের কেউই তাদের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশকে চাপের মুখে ফেলতে পিছপা হননি।
এর উত্তরে ছোট দেশগুলোর আচরণ যেন সেই হলিউড সিনেমা 'গডজিলা' বা 'ডিউন'-এর মতো। অর্থাৎ বিশাল ও রাগান্বিত দুই দানবের হাত থেকে বাঁচতে ছোটরা জোট বেঁধে খুব সাবধানে আর সন্তর্পণে এগিয়ে চলছে, পাছে যেন সেই দানবরা না রেগে যায়!
ফিলিপিন্সের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রিচার্ড হায়দারিয়ান এই সতর্ক চালকে বলেছেন 'ঝুঁকি এড়ানোর নানান রূপ'। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জিয়া ইয়ান চোং খুব পরিষ্কারভাবে বলেন, 'কোনো দেশই যেমন বেইজিংয়ের চোখে খারাপ হতে চায় না, ঠিক তেমনি ওয়াশিংটনের বিরাগভাজন হওয়াও তাদের জন্য সমান ভয়ের।'
চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য ট্রাম্প-শি বৈঠক নিয়ে অন্যান্য দেশের যেমন আশা আছে, তেমনি রয়েছে গভীর আতঙ্ক। ইরান যুদ্ধ আর চীনের তেল সরবরাহে কড়াকড়ির ফলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো, আর তাই তাদের আতঙ্কও সবচেয়ে বেশি।
অনেকেই মনে করেন, এই শীর্ষ বৈঠক ভালোর চেয়ে বরং ক্ষতিই বেশি ডেকে আনতে পারে। আর এসবের পেছনে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, জটিল বিষয়গুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালখুশি আর আবেগতাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
কয়েক মাস ধরেই এশিয়ার দেশগুলোর এই ভয় জোরালো হয়েছে। তাদের শঙ্কা—ট্রাম্প হয়তো শি-র সঙ্গে চুক্তি করতে গিয়ে তাইওয়ানে আমেরিকার অস্ত্র পাঠানো বন্ধ করে দিতে পারেন বা নীতিতে এমন কোনো পরিবর্তন করতে পারেন যা চীনকে সহজে তাইওয়ানের ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তাইওয়ানিজ কর্মকর্তা জানান, যদি এমনটা ঘটে তবে সেটা হবে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, আমেরিকার সাহায্য কমার সম্ভাবনা খুবই কম।
কিন্তু তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো ছাড় বা সুবিধা দেওয়ার মানে হলো অন্য মার্কিন অংশীদারদেরও এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতায় ফেলা। এর ফলে, চীন অন্যান্য বিরোধপূর্ণ জায়গা যেমন—ভারতের সীমানা বা দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নিয়ন্ত্রণকে আরও জোরদার করতে পারে।
ভিয়েতনামের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে বেশ চিন্তিত। তাদের মতে, ট্রাম্প যদি বড় কোনো ছাড় নাও দেন, তবুও শি-কে তোয়াজ করতে গেলে চীন সুযোগ পেয়ে আরও শক্তিশালী হবে। ফলে এশিয়ার অন্যান্য ছোট দেশগুলোর ওপর চীনের খবরদারি বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকবে।
আরও একটা ভয়ের ব্যাপার হলো—চীনের সাথে অর্থনীতিতে কিছু ছাড় পেতে ট্রাম্প হয়তো তার আগের সব নিরাপত্তা চুক্তি থেকে পিছিয়ে আসতে পারেন। ইরান যুদ্ধের জন্য প্যাসিফিক থেকে ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ সরিয়ে নেওয়ায় এশিয়া থেকে মার্কিন সেনা সরানোর বিষয়টি ইতিমধ্যেই গতি পেয়েছে।
যখন ট্রাম্প জার্মান চ্যান্সেলরের ওপর বিরক্ত হয়ে জার্মানি থেকে কমপক্ষে ৫ হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, তখনই এটি সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল যে যেকোনো চুক্তি বা যৌথ প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি এক নিমেষেই কীভাবে ধসে যেতে পারে।
ট্রাম্প অতীতে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারেরও হুমকি দিয়েছিলেন। জাপানে ৫৩ হাজার এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে যে, চীন যদি ট্রাম্পকে বড় কোনো প্রস্তাব দেয়, তবে ট্রাম্প কি সেখান থেকেও সেনা কমানোর সিদ্ধান্তে রাজি হবেন?
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, 'আওকাস' বা অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার মধ্যে চীনের প্রভাব কমানোর এক বিশেষ নিরাপত্তা চুক্তি—এটিও বাতিল হয়ে যেতে পারে। কারণ এই চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়াকে নিউক্লিয়ার চালিত সাবমেরিন এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দেওয়ার কথা ছিল, যার চরম বিরোধী চীন।
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিউ হোয়াইট জানান, আমেরিকার ওপর ভরসা হারানো এখন একটি কঠিন সত্য। যার ফলে এখন এসব মিত্র দেশ নিজেরাই একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসতে চাইছে।
নেতারা প্রকাশ্যে যতটা সাবধানে কথা বলেন, বাস্তবে তাদের ভয় এর চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করেন তিনি।
ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশগুলো এখন প্রকাশ্যে না হলেও ব্যক্তিগতভাবে বলতে শুরু করেছে যে, তারা আর আমেরিকার ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না। দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির এ বিষয়ে করা মন্তব্য অনেককে অবাক করেছিল।
তিনি বলেছিলেন, 'আমরা কোনো সাধারণ বদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না, আমরা আসলে একটি বিপর্যয়ের মাঝখানে রয়েছি।' তার এই কথা সেখানে বেশ হাততালি পেয়েছিল, যা প্রমাণ করে অনেকেই মনে-প্রাণে তা বিশ্বাস করে।
প্রকাশ্যে তারা ট্রাম্পকে নিয়ে বেশি সমালোচনা না করে নীরবে চলার নীতি গ্রহণ করেছে, তবে একই সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখাও তাদের কৌশল।
তবে এক্ষেত্রে কেউ একা কোনো সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবছে না। জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাচি দেশের সঙ্গে জোরালো সামরিক চুক্তির বিষয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকলেও তার প্রশাসন আমেরিকাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। তারা ভয় পাচ্ছে আমেরিকা তাদের পদক্ষেপগুলোকে নেতিবাচকভাবে দেখতে পারে।
অন্যরাও এ ব্যাপারে একইভাবে ভাবছে। সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি যখন ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া সফর করেছিলেন, তখন তার আমেরিকার সমালোচনামূলক মন্তব্য বা সতর্কবাণীগুলোতে কোনো নেতাই প্রকাশ্যে সায় দেননি।
একদিকে যেমন মধ্যম শক্তিগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে, তেমনি আবার পরাশক্তি চীনের ওপর রাগ প্রকাশেও তারা সাবধানে চলছে। যেমন, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ যারা চীনের সঙ্গে নিজেদের বিরোধ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তারা জাপানের চারপাশে তেমন একটা জোটবদ্ধ হয়নি, যতটা টোকিও আশা করেছিল।
কারণ, এর আগে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাচি জাপানের পার্লামেন্টে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে চীন তাইওয়ানকে আক্রমণ করলে জাপান সামরিকভাবে জবাব দেবে, যার ফলে দেশগুলোর মাঝে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল।
ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা তাকাচিকে চীনের সমালোচনা এড়াতে অনুরোধ করেছিলেন যখন মে মাসে তিনি হ্যানয়ে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এ নিয়ে চীনও তাকে কড়া কথা বলতে ছাড়েনি এবং তার কূটনৈতিক ভ্রমণকে 'যুদ্ধের প্রস্তুতি' বলে সমালোচনা করেছিল।
কিন্তু এসব উত্তেজনা সত্ত্বেও মধ্যম শক্তির দেশগুলো নিজেদের সম্পর্ক মজবুত করার কাজ বন্ধ রাখেনি। ভিয়েতনাম এবং জাপান সম্প্রতি উপগ্রহের ডেটা ভাগাভাগি থেকে শুরু করে বৃহত্তম তেলের শোধনাগারে সরবরাহ রক্ষা করার মতো ছয়টি চুক্তি সই করেছে। এটি শুধু সম্পর্ক নয়, বরং সংকট মোকাবিলার দারুণ এক জোট হয়ে উঠেছে।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক রবার্ট ও কিওহান এ বিষয়ে বলেন, 'আমেরিকা যেহেতু আগের মতো আর ভরসার জায়গা নেই, তাই এসব দেশের বিকল্প তৈরি করার চিন্তাটি খুবই যৌক্তিক। যদি তৈরি হওয়া এই বিকল্প কিছুটা দুর্বলও হয়, তারপরও কিছু না থাকার চেয়ে তা অনেক ভালো।'
