চীনের ‘থার্ড ফ্রন্ট’: যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় মাও সে-তুং এর সামরিক কৌশল কি ফিরিয়ে আনা হচ্ছে?
চীনের সিচুয়ান প্রদেশের পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগোলে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। দেশের অন্যতম ব্যস্ত শহরগুলো থেকে কয়েক ঘণ্টা গাড়ি চালালেই দেখা মিলবে এক পরিত্যক্ত সামরিক পরীক্ষার ধ্বংসাবশেষের।
একসময় যেসব অতিগোপন কারখানায় হাজার হাজার মানুষ কাজ করত, সেগুলো এখন লতাপাতায় ঢাকা। এককালে চীনের ভবিষ্যৎ গড়তে দেশের নানা প্রান্ত থেকে তরুণদের এখানে আনা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই গ্রামগুলোতে তরুণদের দেখা মেলা ভার। চারদিকে শুধু বয়স্কদের শোনার যন্ত্র (হিয়ারিং এইড) আর এক জায়গায় তো কফিনের বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের এই কারখানাগুলো ছিল দেশটির সবচেয়ে বড় শিল্প কৌশল প্রকল্পের অংশ। ১৯৬৪ সালে মাও সেতুংয়ের হাতে এই প্রকল্পের শুরু। স্নায়ুযুদ্ধের শত্রু যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ক্রমেই বৈরী হয়ে ওঠা সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে চীনের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করাই ছিল এর লক্ষ্য।
এই 'জাতীয় প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে' প্রায় দেড় কোটি (১৫ মিলিয়ন) মানুষ যুক্ত হয়েছিল। প্রায় ১৫ বছর ধরে চলা এই অতিগোপন প্রকল্পে সরকার ২০ হাজার কোটি (২০০ বিলিয়ন) ইউয়ানের বেশি বিনিয়োগ করেছিল।
প্রকল্পটির নাম ছিল 'থার্ড ফ্রন্ট' বা তৃতীয় ফ্রন্ট। মাওয়ের ভাবনা ছিল—চীনের পূর্ব উপকূলের কারখানাগুলো হলো 'প্রথম ফ্রন্ট', আর তার পেছনের ছোট শহরগুলো 'দ্বিতীয় ফ্রন্ট'।
এই দুটি ফ্রন্ট সহজেই শত্রুর নজরে আসতে পারে। তাই তিনি 'তৃতীয় ফ্রন্ট' হিসেবে সিচুয়ানের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং গানসু ও নিংজিয়ার মতো ভেতরের প্রদেশগুলোকে বেছে নিয়েছিলেন। জায়গাগুলো এতই দুর্গম ছিল যে, কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর পক্ষে সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব ছিল।
সিচুয়ানের অনেক কারখানাই হুয়াইং পর্বতমালার প্রাকৃতিক দুর্গের আড়ালে সুরক্ষিত ছিল।
১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করলে এই কারখানাগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হতে থাকে।
১৯৮৫ সালে চীনের তৎকালীন নেতা দেং জিয়াওপিং বলেছিলেন: 'আগামী বেশ কিছু সময় ধরে বড় ধরনের কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই... বিশ্বের সাধারণ গতিবিধি এবং আমাদের চারপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করে আমরা আমাদের আগের ধারণা বদলেছি। এখন আর যুদ্ধের সরাসরি কোনো আশঙ্কা নেই।'
তবে এখন বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ক আবার তেতো হতে শুরু করায় দেংয়ের সেই কথাগুলো সেকেলে মনে হচ্ছে। মার্কিন হামলা ঠেকাতে চীন আবারও তার 'থার্ড ফ্রন্ট' বা পুরোনো সেই দুর্গম এলাকাগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
সামরিক শক্তির দিক থেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চীন হয়তো এরই মধ্যে এগিয়ে গেছে। স্যাটেলাইট ছবির ওপর ভিত্তি করে তৈরি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, পুরোনো কারখানাগুলোর কাছেই চীন তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার বাড়াচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব একটি প্রস্তাব পাস করে। এতে বলা হয়, 'চীনের কৌশলগত পশ্চাৎভূমির (হিন্টারল্যান্ড) উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোর জন্য বিকল্প বা ব্যাকআপ পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে।' এর অর্থ হলো, যেকোনো আগ্রাসন বা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় চীনের দুর্গম প্রদেশগুলোকে ব্যবহার করে দেশের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
মাওয়ের পর চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা শি জিনপিং তার আদর্শের কেন্দ্রে রেখেছেন 'জাতীয় স্বয়ংসম্পূর্ণতা' বা স্বনির্ভরতাকে। ১৯৬৪ সালে মাও যখন 'থার্ড ফ্রন্ট' শুরু করেন, সে বছরই চীন প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। বর্তমানে চীনের হাতে প্রায় ৬০০ পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে বলে ধারণা করা হয়।
মার্কিন সরকারের মতে, আগামী এক দশকে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। আর এই পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধির বড় অংশই হচ্ছে সেই দুর্গম এলাকায়, যেখানে একসময় 'থার্ড ফ্রন্ট' গড়ে উঠেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের সামরিক ব্যয় এখনো বেশ কম হলেও ব্যবধান দ্রুত কমছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, ২০১২ সালে শি জিনপিং যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ছয় ভাগের এক ভাগ। ২০২৪ সাল নাগাদ তা বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে, যার পরিমাণ ৩১৭.৬ বিলিয়ন ডলার।
মার্কিন নৌবাহিনীর অর্থায়নে পরিচালিত নেভাল স্নাতকোত্তর স্কুলের চীনা ইতিহাসবিদ কোভেল মেসকেনস 'থার্ড ফ্রন্ট' নিয়ে একটি বই লিখেছেন। তিনি বলেন, 'আগের চেয়ে পার্থক্যটা হলো, চীন এখন অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে আছে।'
'তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের সেকেন্ড স্ট্রাইক বা দ্বিতীয় আঘাত হানার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে চাইছে। আগে তাদের কোনো স্ট্রাইক সক্ষমতাই ছিল না।' 'সেকেন্ড স্ট্রাইক সক্ষমতা' বলতে কোনো পারমাণবিক হামলার শিকার হওয়ার পর পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালানোর ক্ষমতাকে বোঝায়।
মেসকেনস বলেন, ১৯৬০-এর দশকে চীন ছিল 'অত্যন্ত দরিদ্র একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ'। কিন্তু এখন, অন্তত পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে 'চীন একটি সমকক্ষ শক্তি। তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করে জিততে পারে বা অন্তত রুখে দাঁড়াতে পারে।' (অবশ্য তার এই মন্তব্য মার্কিন নৌবাহিনীর অফিশিয়াল মতামত নয়)।
১৯৬৪ সালের সঙ্গে ২০২৬ সালের একটি বড় পার্থক্য হলো, এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তত্ত্বগতভাবে এই নির্ভরশীলতা যুদ্ধের ঝুঁকি কমানোর কথা। কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে দুই দেশই, বিশেষ করে বেইজিং, বিরল খনিজ বা 'রেয়ার আর্থ'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
তাই বেইজিং ও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা এখন একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন আলাদা করার চেষ্টা করছেন।
হুয়াগুয়াং ইনস্ট্রুমেন্ট ফ্যাক্টরির (যেখানে একসময় সামরিক লেজার তৈরি হতো) পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষের কাছে এখনো বসবাস করেন এক বয়স্ক ব্যক্তি। তিনি বলেন, তার এলাকায় এখন 'খুব অল্প কয়েকজন' মানুষই বেঁচে আছে; ভাঙাচোরা ভবনগুলোর বেশিরভাগ অ্যাপার্টমেন্টই খালি।
'১৯৯০-এর দশকেও জায়গাটি বেশ জমজমাট ছিল, অনেক মানুষ ছিল,' তিনি বলেন। 'মানুষের হাতে এখন টাকা আছে, তাই সবাই শহরের দিকে ছুটছে।'
কাছেই ১৯৬৬ সালে চালু হওয়া হংগুয়াং ইনস্ট্রুমেন্ট ফ্যাক্টরি। যুদ্ধবিমান তৈরির এই কারখানায় একসময় প্রায় ২ হাজার কর্মী থাকতেন। এখন সেখানে সারি সারি বাঁধাকপি আর ক্যানোলা (সরিষাজাতীয় ফসল) চাষ হচ্ছে। এক বৃদ্ধ কৃষক বাঁশের ঝুড়িতে করে তার ফসল নিয়ে যাচ্ছেন। দেখে মনে হয়, চীনের শিল্পায়নের জোয়ার একসময় স্থানীয়দের ভবিষ্যতের দিকে ছুড়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখন তারা আবার সেই ধীরগতির, গ্রামীণ জীবনে ফিরে গেছেন।
প্রচুর বিনিয়োগ হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭০-এর দশকে পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হওয়ায় কারখানাগুলো পরিত্যক্ত হয় বা বেসামরিক কাজে লাগানো শুরু হয়। চীন তখন আর হামলার ভয় করছিল না এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছিল। মেসকেনস বলেন, 'যেকোনো বড় শহর থেকে ৩০০ মাইল দূরে কোনো গুহায় গাড়ির কারখানা করার তো কোনো মানে হয় না। অর্থনৈতিকভাবে এটা একদমই যুক্তিযুক্ত ছিল না।'
শি জিনপিং বিশ্বমঞ্চে চীনের স্বনির্ভরতা ও শ্রেষ্ঠত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। মাওয়ের মতো তিনিও চীনকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি বানানোর স্বপ্ন দেখেন, তবে পার্থক্য হলো—এখন সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার সময় এসেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ায় ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের অস্ত্র আমদানি আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ৭০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
ছয় দশক পর 'থার্ড ফ্রন্ট'-এর সেই পুরোনো ধারণাগুলো আবার ফিরে আসছে। সেই সঙ্গে অনেকেই ভয় পাচ্ছেন যে পুরোনো সেই বৈরী ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশও হয়তো ফিরে আসছে। মেসকেনস বলেন, 'অবশ্যই পরিস্থিতি আবার বৈরী হয়ে উঠছে। আমরা একধরনের স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যেই আছি।' তার মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত এই যুদ্ধকে যেন 'স্নায়ুযুদ্ধ' বা কোল্ড ওয়ার হিসেবেই আটকে রাখা যায়। নতুন করে অস্ত্র বানানোর চেয়ে কারখানার ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকাটাই তো মঙ্গলের।
