ইরান যুদ্ধ যেভাবে ভারতকে মুদ্রা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে
অর্থনীতির সূচক যখনই হতাশাজনক হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তখনই তার দলের নতুন কোনো জাঁকজমকপূর্ণ প্রচার অভিযান সামনে নিয়ে আসেন। সম্প্রতি ভারতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে তিনি বেশ চমৎকার একটি সুবর্ণ সময়ের (গোল্ডিলকস মোমেন্ট) কথা বলেছিলেন।
তবে মোদি এখন এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, যা কোনো প্রচার দিয়ে ঢাকা সম্ভব হচ্ছে না—আর সেটি হলো ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকা রুপির মান।
২০২৫ সালে এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স ছিল ভারতীয় রুপির। সে বছর এর মান পড়েছিল ৫ শতাংশ। পতনের সেই ধারা চলতি বছরেও অব্যাহত রয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির জন্য এক মহাবিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হু হু করে বাড়তে থাকা তেলের দাম এখন বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
১ জানুয়ারি থেকে রুপির মান আরও ৫.৫ শতাংশ কমেছে। এশিয়া ডিকোডেড-এর অর্থনীতিবিদ প্রিয়াঙ্কা কিশোরের মতে, ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম উচ্চ 'কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট' বা চলতি হিসাবের ঘাটতির দেশ। এ কারণে রুপির মান আরও কমে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
ওয়েলস ফার্গো এবং ভ্যান এক অ্যাসোসিয়েটসের বিশ্লেষকদের আশঙ্কা যদি সত্যি হয়, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাদের মতে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ডলারের বিপরীতে রুপির মান বর্তমানের ৯৫ থেকে ১০০-র দিকে চলে যেতে পারে।
ব্রোকার ইকুইটি গ্রুপের গবেষক আহমেদ আইজান ব্লুমবার্গকে বলেন, 'প্রতি ডলারে ১০০ রুপি এখন আর কেবল আশঙ্কার বিষয় নয়; বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে এটিই হবে বাস্তব চিত্র। সরকার এখন যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেগুলো কাঠামোগত সমাধানের চেয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার সরঞ্জাম মাত্র।'
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) বর্তমান তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে, এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি এখন কেবল যেকোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার দল রুপির এই পতন ঠেকাতে বৈদেশিক মুদ্রার পজিশন সীমিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার ফলাফল শূন্য।
মুদ্রা বাজারে স্টক ব্যবসায়ীরা রুপির দরপতন নিয়ে বাজি ধরছেন, কিন্তু আরবিআই তাদের থামাতে পারছে না। এদিকে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দীর্ঘ মেয়াদে ১০০ ডলারের ওপরে থিতু হয়েছে। অথচ গত অক্টোবরে মালহোত্রার দল যখন পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন, তখন তেলের দামের ভিত্তি ধরা হয়েছিল ৭০ ডলার। তেলের এই আকাশচুম্বী দামের কারণে ভারতের মাসিক তেল আমদানি বিল ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলার বেড়ে যাচ্ছে।
সিস্টেম্যাটিক ইনস্টিটিউশনাল ইকুইটিজ-এর বিশ্লেষক সিদ্ধার্থ রাজপুরোহিত বলেন, 'তেলের দাম ১০০ ডলারের আশেপাশে থাকলে রুপির ওপর চাপ চলতেই থাকবে।' তিনি মনে করেন, এই সংকট মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) খুব শিগগিরই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
আরবিআই এখন ভারতের বড় ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের ডলার সরবরাহ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। রুপির মান ধরে রাখতে আরবিআই আড়ালে থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করছে। ২০২৫ সালে তারা রেকর্ড ৫ হাজার ১৭০ কোটি (৫১.৭ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করেছে। শিনহান ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান কুনাল সোধানি বলেন, 'আরবিআই-এর নির্দেশনা বাজারে ডলারের স্বল্পমেয়াদী জোগান নিশ্চিত করছে। তবে এই সহায়তার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে তেলের দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।'
এই নির্দেশনার ফলে ভারতের ব্যাংকিং খাতে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার শেয়ারের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে ২০২৫ সালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইসিআইসিআই ব্যাংক এবং এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ারের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে তেলের দাম বাড়ার আসল যন্ত্রণা ভোগ করবে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষ। ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে ভারত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় থাকবে।
ভারতের অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানিয়েছেন, রুপির মান কমলে রপ্তানিতে কিছুটা সুবিধা হলেও সামগ্রিকভাবে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। তিনি অবশ্য দাবি করেছেন যে, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১১ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট। তিনি আরও জানান, মোদি সরকার মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।
ফিন্যান্স রেটিং সংস্থা ফিচের বিশ্লেষক টমাস রুকমেকার ভারতকে সেই সব 'জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিকারক' দেশের তালিকায় রেখেছেন, যারা জ্বালানির দাম বাড়লে এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়বে।
দুর্ভোগের এখানেই শেষ নয়। পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এবং তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকটের মধ্যে এই আবহাওয়া পরিস্থিতি অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে। কারণ দেশজুড়ে শীতলীকরণ বা কুলিং ব্যবস্থার জন্য বাড়তি জ্বালানির প্রয়োজন হবে।
তবে রুপির ওপর এই চাপের পেছনে কেবল যুদ্ধ দায়ী নয়, বরং মোদি সরকারের গত ১১ বছরের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের কৌশলী আব্বাস কেশভানি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি ছিল, যা এখন আরও বাড়বে।
মোদি সরকার যত স্লোগানই দিক না কেন, ২০১৪ সালে মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছিল, ভারতের অর্থনীতি আজ সেই অবস্থানে নেই। ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গুজরাট শাসনের মাধ্যমে মোদি যে 'গুজরাট মডেল' দেখিয়েছিলেন, তা সারা দেশে সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। ১১ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর এখন প্রবৃদ্ধির সুবর্ণ সময়ের কথা বলাটা অনেকটা ফিকে হয়ে আসছে।
শুরুতে মোদি বিমান চলাচল থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা, বিমা এবং খুচরা বিক্রয় খাতে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে অনেক বড় ঘোষণা দিয়েছিলেন। ভারতের ওষুধ এবং ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প খাতের সম্ভাবনাও ছিল প্রচুর। কিন্তু অর্জনের খাতা খুব একটা উজ্জ্বল নয়। যেমন—২০১৪ সালে মোদি 'মেক ইন ইন্ডিয়া' কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন।
লক্ষ্য ছিল ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান মোট জিডিপির ২৫ শতাংশে নিয়ে আসা। এর মাধ্যমে তরুণদের বেকারত্ব কমানোর পরিকল্পনা ছিল। কিছু বড় প্রতিষ্ঠান যেমন এয়ারবাস, অ্যাপল বা স্যামসাং ভারতে কারখানা খুললেও প্রায় ১২ বছর পর এই খাতের অবদান জিডিপির মাত্র ১৭ শতাংশে আটকে আছে। এখন জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ার ফলে এই হার বাড়ানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সমস্যার বড় একটি দিক হলো, ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রশাসন যখন নতুন করে যাত্রা শুরু করছে, তখন ভারতের 'মোদিনোমিক্স' বেশ নড়বড়ে ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৬ সালে এসেও মোদি জরুরি সংস্কারের চেয়ে জিডিপি মাইলফলকের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন বলে মনে হয়। এর বড় উদাহরণ হলো জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশা। ২০২৫ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৮ শতাংশ, যা চীনের চেয়ে বেশি। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা এখন হুমকির মুখে।
জাপানকে জিডিপিতে ছাড়িয়ে যাওয়া দিল্লির জন্য বড় জয় হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ১৫ বছর আগে চীন যখন জাপানকে টপকে গিয়েছিল, তখন সেটি জাপানের জন্য বড় ধাক্কা ছিল ঠিকই, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে জাপানের মানুষের জীবনমান কমেনি। একটি অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার চেয়ে মানুষের আয় বাড়াটা অনেক বেশি জরুরি।
চীনের অর্থনীতি জাপানের চেয়ে কয়েক গুণ বড় হলেও চীনের মানুষের মাথাপিছু আয় জাপানের অর্ধেকেরও কম। আবার জাপানের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি।
এই পরিসংখ্যান মোদি সরকারের 'গোলডিলকস' প্রচারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত ভারত কেবল দ্রুত নয়, বরং টেকসই প্রবৃদ্ধির নীতি গ্রহণ না করবে, ততক্ষণ রুপির এই নড়বড়ে অবস্থা কাটবে না। আর এটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, 'নিউ ইন্ডিয়া' নিয়ে মোদি সরকার যতটা প্রচার চালায়, বাস্তবতা আসলে ততটা উজ্জ্বল নয়।
