বৈঠকে বসছেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দুই ব্যক্তি; ইরান, তাইওয়ানসহ যেসব ইস্যুতে আলোচনা হতে পারে
বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠক। আগামী সপ্তাহে বেইজিংয়ে দুই নেতার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের এ শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
দুই দিনব্যাপী এ বৈঠক বৃহস্পতিবার (১৪ মে) শুরু হবে বলে জানা গেছে। এতে ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য, তাইওয়ানসহ দুই দেশের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি বৈঠকে বসেছিলেন। তখন উভয় পক্ষ চলমান তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে সম্মত হয়। ওই বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শতভাগের বেশি শুল্ক আরোপ করেছিল। জবাবে বেইজিং বিশ্ববাজারে 'রেয়ার আর্থ' [বিরল খনিজ] সরবরাহ সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল।
আগামী সপ্তাহের এই সফরটি নির্ধারণ করবে, ওই বৈঠকের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা এক ধরণের অস্থির সমঝোতা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে কি না।
গত বৈঠকের পর থেকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে পরিচিত ইরানকে ঘিরে এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এশিয়া অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মনোযোগও কিছুটা সরিয়ে নিয়েছে।
এ যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারও চাপে পড়েছে। ফলে কিছু চীনা বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানকে রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাইওয়ান ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে শি জিনপিংও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা চীনের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর চীনা অর্থনীতি বৈশ্বিক মন্দায় বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আলোচনার টেবিলে যা যা থাকছে
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকে বাণিজ্য ইস্যুই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। এর মধ্যে একে অপরের দেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়ও থাকতে পারে। ওয়াশিংটন মূলত 'ফাইভ বি'-এর ওপর জোর দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে— চীনের মাধ্যমে বোয়িং উড়োজাহাজ, মার্কিন গরুর মাংস ও সয়াবিন কেনা, পাশাপাশি একটি বিনিয়োগ বোর্ড ও একটি বাণিজ্য বোর্ড গঠন। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এমন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা, যা জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করবে না।
অন্যদিকে চীন গুরুত্ব দিচ্ছে 'থ্রি টি' বা তিনটি বিষয়ে— শুল্ক, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। ধারণা করা হচ্ছে, গত বছরের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি আরও দীর্ঘায়িত করা এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি তুলবে চীন। শিল্পখাত আধুনিকায়নে এসব চিপের প্রয়োজন রয়েছে দেশটির।
শি জিনপিং ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে বলেছিলেন, চীন 'কখনোই তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন হতে দেবে না'। তাই বৈঠকে তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমানোর জন্যও ট্রাম্পের ওপর চাপ দিতে পারেন তিনি।
এদিকে ট্রাম্প বেইজিংকে ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি কর্মী জিমি লাইয়ের বিষয়টিও তুলবেন। গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এছাড়া চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বৃদ্ধি, দক্ষিণ চীন সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল প্রবাহ কমানোর বিষয়ও আলোচনা হতে পারে।
সম্ভাব্য ফলাফল যা হতে পারে
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য করেন। তিনি শিকে 'বন্ধু' বলে উল্লেখ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে বড় কোনো ঘোষণা দিতে উন্মুখ হয়ে আছেন।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই বৈঠক থেকে বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক চুক্তি বা দুই দেশের গভীর মতপার্থক্যের সমাধান আসার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। বরং বিনিয়োগসংক্রান্ত কিছু সীমিত সমঝোতা এবং গত বছরের অস্থায়ী বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর মতো ফল আসতে পারে।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ঝাও মিংহাও বলেন, 'এই বৈঠক থেকে খুব বড় বা যুগান্তকারী কোনো অগ্রগতির আশা করা ঠিক হবে না।' তার মতে, এটি মূলত ভবিষ্যতে আরও আলোচনা ও যোগাযোগের সূচনা হিসেবে কাজ করবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরে ট্রাম্প ও শি চারবার পর্যন্ত বৈঠক করতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান প্রতিযোগিতার মধ্যেও একে অপরের ওপর নির্ভরতা কমাতে সময় কিনে নেওয়ার কৌশল হিসেবেও এই শীর্ষ বৈঠককে দেখছে দুই পক্ষ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বনি লিন বলেন, 'চীনের ভেতরে এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গভীর সন্দেহ কাজ করছে।'
যেসব কারণে আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিরোধ এই আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। শি জিনপিং গত মাসে নাম উল্লেখ না করেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষার সমালোচনা করেন। তিনি একে 'জঙ্গলের আইনে ফিরে যাওয়া' বলে মন্তব্য করেছিলেন।
চীন একদিকে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে উৎসাহ দিচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে এখনো অনাগ্রহী। বেইজিং এই সংঘাতকে মূলত ওয়াশিংটনের সমস্যা হিসেবে দেখছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে ওয়াং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে আরও উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের 'বৈধ অধিকার' ইরানের রয়েছে এবং চীন সেই অধিকারের পক্ষে রয়েছে।
তবে ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রতি সম্মান দেখিয়েই চীন ইরানের অবস্থানকে আরও বেশি সমর্থন দেয়নি বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র— উভয় দেশই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানি তেল কেনার অভিযোগে একটি চীনা তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এর জবাবে চীন নিজেদের কোম্পানিগুলোকে সেই নিষেধাজ্ঞা মানতে নিষেধ করে এবং বিদেশি কোম্পানি ও সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর ক্ষমতা দিয়ে নতুন বিধিমালাও জারি করে।
