উপসাগরীয় নিরাপত্তা উপেক্ষিত: হরমুজে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কি মেনে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টিতে জোর দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। আর এটি তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে। সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের একটি সতর্কবার্তার পর তাদের এই উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, সামগ্রিক উত্তেজনা কমানোর বদলে শুধু হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াই হয়তো এই আলোচনার মূল অর্জন হবে।
কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা আঞ্চলিক বিষয়াদি নিয়ে হয়তো খুব বেশি কথা হবে না। এর বদলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সামলানো যায়—সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হবে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়।
উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা, এমন পদক্ষেপ নিলে তা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করবে। আর যারা সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে, সেই দেশগুলোকেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হচ্ছে।
উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতি এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির চেয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানো এবং হরমুজের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণকে পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকেছে।
যদিও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনা এখনো স্থবির হয়ে আছে। কারণ ইরান সমৃদ্ধকরণকে শূন্যে নামিয়ে আনা কিংবা নিজেদের মজুত বিদেশে পাঠানোর দাবি—দুটোই প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে উপসাগরীয় কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনার অগ্রাধিকারের এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয়।
সরকার-ঘনিষ্ঠ একটি উপসাগরীয় সূত্র জানায়, 'দিনের শেষে হরমুজই হবে রেড লাইন (চূড়ান্ত সীমারেখা)। আগে এটি কোনো ইস্যু ছিল না, কিন্তু এখন এটিই বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।' তবে এসব বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে উপসাগরীয় আরব সরকারগুলোর কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
'হরমুজ একটি সোনার খনি'
এবারই প্রথম আলোচনার টেবিলে হরমুজ একটি দর কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। গত ৮ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হরমুজের এই ভূমিকার কথা স্পষ্ট করেছিলেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। তিনি বলেছিলেন, 'ওয়াশিংটন ও তেহরানের যুদ্ধবিরতি কোন দিকে যাবে তা স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করে ফেলেছে। আর সেই অস্ত্রের নাম হরমুজ প্রণালি। এর শক্তি অফুরন্ত।'
ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও একান্তে একই কথা বলছেন। তারা এই প্রণালিকে শুধু একটি আপৎকালীন ব্যবস্থা নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রস্তুত করা একটি প্রতিরোধমূলক হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র জানায়, 'হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য ইরান বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে, প্রতিটি পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেছে। এটি এখন ইরানের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।'
সূত্রটি এই প্রণালিকে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানের গভীরে থাকা এক 'অমূল্য সোনার খনি' হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা 'বিশ্ব চাইলেও তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না'।
উপেক্ষিত উপসাগরীয় নিরাপত্তা
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো যখন বারবার এই অঞ্চলে আঘাত হানছে, তখন আলোচনার প্রায় সবটাই হরমুজকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বেশি হওয়ায় উপসাগরীয় নিরাপত্তার বিষয়টি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।
এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট এবতেসাম আল-কেতবি বলেন, 'আজ যা হতে যাচ্ছে, তা কোনো ঐতিহাসিক মীমাংসা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের একটি ইচ্ছাকৃত নকশা।' তিনি প্রশ্ন করেন, 'ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রক্সিদের (আঞ্চলিক ছায়াগোষ্ঠীগুলো) জন্য কারা সবচেয়ে বেশি ভুগছে? ইসরায়েল এবং বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো। আমাদের জন্য ভালো চুক্তি হলো (আলোচনায়) ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি এবং হরমুজ—সবকিছু থাকা। কিন্তু মনে হচ্ছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রক্সি নিয়ে কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না।'
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সতর্কতা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা, রপ্তানি এবং বিমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়া—এর সবকিছুই ভুগিয়েছে দেশগুলোকে। বিকল্প বাণিজ্যপথগুলোও ব্যয়বহুল এবং সেখানেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি রয়েছে।
কূটনীতিকরা জানান, উপসাগরীয় কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনকে একবারে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বারণ করেছেন। তারা ধাপে ধাপে ইরানের আচরণ পরীক্ষা করার পক্ষে। তারা বলছেন, মূল হুমকিগুলোর কোনো সমাধান এখনো হয়নি। বিশেষ করে উপসাগরীয় রাজধানীগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইরানের সশস্ত্র প্রক্সিগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি।
একতরফা মার্কিন সিদ্ধান্তের কারণে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে এখন চাপা ক্ষোভ, হতাশা ও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। সৌদিভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন,'যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ... কিন্তু এর মানে এই নয় যে তারা সবাইকে বাদ দিয়ে একতরফাভাবে সবকিছু করবে।'
উপসাগরীয় আরব শাসকরা বলছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা চুপ করে আছেন। এই নীরবতা শুধু কূটনৈতিক কারণে নয়, বরং এই সংঘাতের অনিশ্চয়তাও এর অন্যতম কারণ। এই যুদ্ধের জন্য তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়লেও, এই সংঘাত তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
তবে এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে দূরে রাখা নিয়ে সেখানকার কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালির বিশাল গুরুত্বের কারণে তাদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি এখন আর শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
