'ইকোনমিক ফিউরি': ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজে উঠে তল্লাশির প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলের ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে তল্লাশি চালানোর এবং সেগুলো জব্দের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তাদের নৌ-অবরোধ ও অভিযানকে বিস্তৃত করছে।
এই অভিযানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই নতুন পর্যায়ের অভিযানের নাম দিয়েছেন 'ইকোনমিক ফিউরি'। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশাবাদী যে এই নৌ-অবরোধ ও নতুন কঠোর পদক্ষেপগুলো একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তির পথ সুগম করবে।
এই পরিকল্পনাটি এমন এক সময়ে আসছে যখন ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করছে। গত শনিবার তারা বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে যে এই নৌপথটি ইরান এখন থেকে 'কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ' করবে। অথচ মাত্র একদিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে প্রণালিটি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত, যে ঘোষণাটিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাগত জানিয়েছিলেন। বর্তমান এই অনিশ্চয়তার কারণে জাহাজ কোম্পানিগুলো নতুন করে সংকটে পড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই বর্ধিত অর্থনৈতিক চাপের মূল লক্ষ্য হলো তেহরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য করা। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরান তাদের উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে, যদিও তেহরান এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে অন্তত ২৩টি জাহাজকে ইরানের বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। এখন এই অভিযানের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে যাতে পারস্য উপসাগরের বাইরে থাকা ইরানি তেল বা অস্ত্রবাহী জাহাজগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়।
জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন গত বৃহস্পতিবার বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে যে কোনো ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ বা ইরানকে বস্তুগত সহায়তা প্রদানের চেষ্টাকারী যে কোনো জাহাজকে ধাওয়া করবে। এর মধ্যে ইরানি তেল বহনকারী ডার্ক ফ্লিট (গোপন নৌবহর) অন্তর্ভুক্ত। আপনারা অনেকেই জানেন যে, ডার্ক ফ্লিট হলো সেই সব অবৈধ জাহাজ যারা আন্তর্জাতিক নিয়ম, নিষেধাজ্ঞা বা বীমার শর্ত এড়িয়ে চলাচল করে।'
দুই দেশের মধ্যে বর্তমান সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী সপ্তাহে শেষ হতে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনা কোনো বড় অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে মার্কিন বাহিনী পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করতে 'সর্বোচ্চভাবে প্রস্তুত' আছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন স্থলবাহিনী ব্যবহারের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। অন্যদিকে, হেগসেথ ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলার হুঁশিয়ারি দিলেও তাতে সৌদি আরবের মতো মিত্রদের ওপর পাল্টাহামলার ঝুঁকি রয়েছে।
হোয়াইট হাউস এই সংঘাত থেকে উত্তরণের পথ এবং একটি রফা খুঁজছে, আর তাই এখন অর্থনৈতিক চাপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইরানের দৈনিক প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বড় অংশই যায় চীনের ছোট ও স্বাধীন 'টিপট' শোধনাগারগুলোতে। যদিও চীন এই সংঘাতের ধাক্কা সামলাতে কয়েক মাস ধরে তেলের মজুদ বাড়িয়েছে, তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জেনারেল কেইনের মন্তব্য বেইজিংয়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বুধবার জানিয়েছে যে, তারা ইরানের অবৈধ তেল বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়াতে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও নতুন জাহাজ, কোম্পানি এবং ব্যক্তির নাম যুক্ত করছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের মতে, নতুন করে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত এই জাহাজ এবং কোম্পানিগুলো তেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোসেন শামখানির নিয়ন্ত্রণে। তিনি আলী শামখানির ছেলে, যিনি ফেব্রুয়ারির শেষে যুদ্ধের সূচনা করা সেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন।
এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের আগের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা কয়েকশ ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ এখন মাঝসমুদ্রে তল্লাশি ও জব্দের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, যারা এই নিষিদ্ধ ইরানি তেল কেনাবেচা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই বছরের শুরুর দিকেই মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে ট্যাঙ্কার খুঁজে বের করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যখন তারা আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরে ভেনেজুয়েলা-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে আটকে দিয়েছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর তখন বিচার বিভাগ এবং কোস্ট গার্ডের মতো আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে সেইসব জাহাজ জব্দ করেছিল যারা মার্কিন আইন ও নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছিল।
এমোরি ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক নেভিট বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে সমুদ্রে তিনটি বড় পদক্ষেপের সাথে যুক্ত: ইরানের কাছাকাছি এলাকায় নৌ-অবরোধ, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে থাকা 'ডার্ক ফ্লিট' বা গোপন নৌবহর জব্দ করা এবং মিসাইলের যন্ত্রাংশের মতো নিষিদ্ধ চোরাচালান পণ্য আটকে দেওয়া।
নেভিট বলেন, 'এটি একটি সর্বোচ্চবাদী কৌশল। আপনি যদি ইরানের ওপর পূর্ণ চাপ তৈরি করতে চান, তবে আপনার কাছে থাকা প্রতিটি আইনি ক্ষমতাকেই ব্যবহার করতে চাইবেন।'
