'জড়িয়ে ধরার' জাদুকরী ক্ষমতা: মানুষের স্পর্শের রয়েছে যেসব উপকারিতা
হঠাৎ সামনে কোনো রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী এসে দাঁড়ালে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? সম্ভবত জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালানো। তাকে 'জড়িয়ে ধরার' কথা নিশ্চয়ই কারও মাথায় আসবে না!
কিন্তু ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের সেন্ট জেমস হাসপাতালে ঠিক এমন এক অবিশ্বাস্য ও জীবনরক্ষাকারী ঘটনাই ঘটেছিল। নাথান নিউবি (৩৫) নামের এক রোগী জানতে পারেন, মোহাম্মদ ফারুক নামের এক সন্ত্রাসী হাসপাতালে বোমা ফাটিয়ে 'যত বেশি সম্ভব নার্সকে হত্যার' পরিকল্পনা করেছে।
হাসপাতালের বাইরে ফারুকের মুখোমুখি হন নিউবি। তাকে দেখে খুব অস্থির মনে হওয়ায় নিউবি গল্প জুড়ে দেন। একপর্যায়ে ফারুক যখন স্বীকার করে যে তার ব্যাগে বোমা আছে, তখন নিউবি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ফারুক কয়েকবার তাকে জড়িয়ে ধরার অনুরোধ করে। নিউবি রাজি হন। জড়িয়ে ধরার পর ফারুক বলে, 'আমার মন বদলানোর আগেই আপনি পুলিশকে ফোন করুন।'
পরে ফারুককে অন্তত ৩৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে নাথান নিউবিকে 'জর্জ মেডেল' দেয়া হয়।
ভাবলে অবাক হতে হয়, কেবল একটি সাধারণ আলিঙ্গনই সেদিন কত বড় এক রক্তপাত ঠেকিয়ে দিয়েছিল! এটি একটি চরম উদাহরণ হলেও পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, মানুষের একটি সাধারণ স্পর্শের কতটা ক্ষমতা আছে।
স্পর্শ কেন এত জরুরি?
স্পর্শ মানুষের একটি মৌলিক ও জন্মগত চাহিদা। এটি শরীর ও মনের জন্য কতটা উপকারী হতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানে বিস্তর গবেষণা রয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরার এই প্রবণতা আমরা প্রাইমেট পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই পেয়েছি। বানর বা উল্লুকরা সামাজিক বন্ধন ও ভালোবাসা বোঝাতে একে অপরের পশম পরিষ্কার করে ও আদর করে দেয়।
একটি আলিঙ্গন ত্বকের নিচে থাকা 'সি-ট্যাকটাইল অ্যাফারেন্ট ফাইবার' নামের বিশেষ স্নায়ুগুলোকে জাগিয়ে তোলে। এগুলো হালকা ও মোলায়েম স্পর্শে সবচেয়ে ভালো সাড়া দেয়। এর ফলে স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয় এবং শরীরে 'অক্সিটোসিন' (বন্ধন সৃষ্টিকারী হরমোন) ও 'এন্ডোরফিন' (মন ভালো করার হরমোন) ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির মুখপাত্র ডা. মাইকেল সুইফট বলেন, 'স্পর্শের সঙ্গে মস্তিষ্কের শান্ত হওয়ার ব্যবস্থার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।' স্নায়ুতন্তুগুলো যখন আবেগ ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশে সংকেত পাঠায়, তখন 'একটি আলিঙ্গন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্বস্তি দিতে পারে; এর জন্য আলাদা করে লজিক বা যুক্তি দিয়ে কিছু ভাবতে হয় না।'
অবশ্য সব স্পর্শের ধরন এক নয়। বাসের ভিড়ে কারও কনুইয়ের গুঁতো খাওয়া আর ভালোবাসার মানুষের মমতাময়ী স্পর্শের প্রতিক্রিয়া কখনোই এক হবে না। বিউপিএ-এর মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. রবি লুখা জানান, একটি আলিঙ্গন কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে, তার ওপরও এর স্বাস্থ্যসুফল নির্ভর করে।
তিনি বলেন, ১০ সেকেন্ডের একটি আলিঙ্গন 'সতেজ বোধ করতে, শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে এবং হতাশা কমাতে সাহায্য করে।' আর আলিঙ্গনটি ২০ সেকেন্ডের বা তার বেশি হলে তা 'হার্টের জন্য বিশেষ উপকারী হতে পারে। এটি মানসিক চাপ ও রক্তচাপ দুটোই কমায়।'
জন্ম থেকেই স্পর্শের জাদু
স্পর্শের এই জাদুকরী সুফল শুরু হয় একেবারে জন্মের পর থেকেই। ডা. সুইফট বলেন, 'জীবনের শুরু থেকেই ধারাবাহিক ও উষ্ণ স্পর্শ শিশুর মনে নিরাপত্তার এক মজবুত ভিত্তি তৈরি করে।' জন্মের পরপরই বাবা-মায়ের সঙ্গে 'স্কিন-টু-স্কিন' বা ত্বকের সংস্পর্শ শিশুর হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এমনকি এটি শিশুর কান্না কমাতেও জাদুর মতো কাজ করে।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও স্পর্শ 'বিশ্বাস ও আশ্বাসের প্রতীক হিসেবে কাজ করে, বিশেষ করে অনিশ্চয়তা বা বিপদের মুহূর্তে।' ২০০৬ সালে ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির এক বিখ্যাত গবেষণায় দেখা যায়, নারীরা যখন চরম মানসিক চাপে থাকেন, তখন সঙ্গীর হাত ধরলে তারা তাৎক্ষণিক স্বস্তি পান।
২০২২ সালে জার্মান গবেষকরা ৩৬টি তরুণ দম্পতির ওপর একটি পরীক্ষা চালান। দেখা যায়, যেসব নারী কোনো চাপের কাজ বা পরীক্ষার আগে তাদের পুরুষ সঙ্গীকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, তাদের শরীরে 'কোর্টিসল' নামের স্ট্রেস হরমোন অনেক কম মাত্রায় বেড়েছে।
পরিচিত বা ভালোবাসার মানুষের স্পর্শে এই সুফলগুলো বেশি পাওয়া যায়, এটা সত্যি। তবে ২০১৭ সালে ইউসিএল-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর 'একজন অপরিচিত মানুষের ধীর ও কোমল স্পর্শও' একাকিত্ববোধ ও মানসিক কষ্ট কমাতে পারে।
রোগ প্রতিরোধেও আলিঙ্গন
আলিঙ্গন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকেও শক্তিশালী করে। পিটসবার্গের কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা সর্দি-কাশির ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার আগের দুই সপ্তাহ নিয়মিত আপনজনদের আলিঙ্গন করেছিলেন, তাদের সংক্রমিত হওয়ার বা সর্দি লাগার সম্ভাবনা কম ছিল। আর যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের লক্ষণও খুব সাধারণ ছিল এবং তারা দ্রুত সেরে উঠেছিলেন।
২০২১ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় বয়স্ক আমেরিকানদের ওপর নজর রাখা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, যারা শেষ বয়সে প্রিয়জনদের কাছ থেকে বেশি আলিঙ্গন ও স্পর্শ পান, তাদের 'ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন' বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা ব্যথাবেদনায় ভোগার আশঙ্কা অনেক কম থাকে।
স্পর্শের অভাব
বিপরীতভাবে, স্পর্শ ও আলিঙ্গনের অভাবে শরীরে কোর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়ায়। বছর ছয়েক আগে কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় মানুষ যখন বাইরের কাউকে স্পর্শ করতে পারত না, তখন তারা 'টাচ ডিপ্রাইভেশন' (স্পর্শবঞ্চনা) বা 'স্কিন হাঙ্গার' (ত্বকের ক্ষুধা) শব্দগুলোর যন্ত্রণার সঙ্গে খুব ভালোভাবে পরিচিত হয়েছিল।
তবে মহামারির আগেও 'স্পর্শের সংকট' নিয়ে আলোচনা ছিল। মানুষ ক্রমশ অনলাইনমুখী ও স্ক্রিননির্ভর জীবনযাপন করছে। সামনাসামনি আড্ডার জায়গা দখল করে নিয়েছে ফোনের স্ক্রিন ও ইমোজি। কোভিডের পর এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে। স্ক্রিননির্ভর এই জীবন অনেককেই একাকী এবং স্পর্শ-বঞ্চিত করে তুলেছে।
আর এই শূন্যতা পূরণে এখন বাণিজ্যিকভাবেও নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ২০১২ সালে জাপানে প্রথম 'কাডল ক্যাফে' খোলা হয়। সেখানে টাকার বিনিময়ে কর্মীর সঙ্গে আলিঙ্গন করা, হাত ধরা বা পাশে ঘুমানোর সুযোগ মেলে যেখানে কেউ বিচার করতে আসবে না। এই ধারা এখন যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছেছে। এমনকি আবেগ প্রকাশে রক্ষণশীল বলে পরিচিত যুক্তরাজ্যেও এখন 'কাডল থেরাপিস্ট' পাওয়া যায়, যারা টাকার বিনিময়ে নির্দোষ স্পর্শ বা দলবদ্ধ আলিঙ্গন সেশনের ব্যবস্থা করে থাকেন।
টাকা দিয়ে আলিঙ্গন কেনার এসব উদ্যোগ দেখে অনেকেই হয়তো ভুরু কুঁচকাতে পারেন। কিন্তু ব্যস্ত এই যান্ত্রিক জীবনে সবারই হয়তো এই ছোট্ট ও অমূল্য আলিঙ্গনের জাদুকরী ক্ষমতাকে আরেকটু বেশি কদর করা উচিত।
