দেশজুড়ে হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাব: সমস্যা কোথায়, করণীয় কী?
বাংলাদেশ প্রথমে ২০২০ সালের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও পরে সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২০২৬ সাল করা হয়। কিন্তু নির্মূল দূরে থাক, দেশ এখন উল্টো হামের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়াই করছে। এরইমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগ। চলতি বছর এ পর্যন্ত হামে মারা গেছে প্রায় ৩৪ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ জানান, এখন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬৭৬ জন। তবে নিশ্চিত মৃত্যুর কোন তথ্য নেই।
বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে ১৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন এবং রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে ১ জন করে শিশু মারা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর অপুষ্টি, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার অনেক কমে যাওয়া, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে হামের টিকাদানের কাভারেজ ছিলো ৫৭.১ শতাংশ, যা গত ৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কাভারেজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও ২০২৫ সালে তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলেন, 'হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ৯০-৯৫ শতাংশ টিকাদান কাভারেজ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তা অনেক ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
'এর ফলে কয়েক লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যারা এখন সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে—এবং সেখান থেকেই ছোট শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।'
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী সতর্ক করে বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ১৮ জন পর্যন্ত এই রোগে সংক্রমিত হতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে উচ্চমাত্রার টিকা কাভারেজ অত্যন্ত জরুরি। সংক্রমণ থামাতে শিশুদের নয় ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং টিকার কাভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশ হওয়া অপরিহার্য।
বর্তমানে দেশে প্রথম ডোজের টিকার কাভারেজ প্রায় ৮৫ শতাংশ ও দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ প্রায় ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ১৫-২০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে রয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতি বছর টিকা কাভারেজের বাইরে থাকা শিশু বাড়তে থাকা বর্তমানের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার মূল কারণ ছিল হুট করে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেওয়া। ১৯৯৮ সাল থেকে দেশে সেক্টর প্রোগ্রামের আওতায় স্বাস্থ্যের সব কার্যক্রম চলছিলো।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'এক্সিট প্ল্যানের কোন পরিকল্পনা ছাড়াই সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেওয়ায় তখন ভ্যাকসিন পরিবহন খরচের অভাবে ঠিকমতো ভ্যাকসিন সেন্টারে না পৌঁছানোসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয়।'
২০২৫ সালে স্পেশাল টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি একই সময়ে টাইফয়েডের ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের কারণে। ফলে অনেক শিশু টিকা কাভারেজের বাইরে থেকে যায়। ২০২৫ সালের মার্চে কেনা ৪৫৮ কোটি টাকার টিকা জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে দেওয়া হলেও পরের মাসগুলোতে ফের টিকার সংকট দেখা দেয়।
টিবিএস ২০২৫ সালের মার্চ মাসেই এই সংকট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সে সময় লক্ষ্মীপুরের স্বাস্থ্য সহকারী নিখিল চন্দ্র দাস বলেছিলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট থেকেই টিকার এই সংকট শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, 'পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন ওয়ার্ডের আটটি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুই-তিনটিতে টিকাদান কার্যক্রম চালাতে পেরেছিলাম। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ জেলার সব টিকাদান কেন্দ্রে পাঁচ ধরনের টিকা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়।'
হঠাৎ অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধের সিদ্ধান্তকে 'হঠকারী' বলে মন্তব্য করেন বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, কোনো চলমান জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি হঠাৎ করে বন্ধ বা পরিবর্তন করলে তার প্রভাব কিছু সময় পরে দৃশ্যমান হয়, কিন্তু একবার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে হামের ক্ষেত্রে সেই পরিস্থিতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে যক্ষ্মা, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া বা এইচআইভির মতো রোগের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে সরকার জুনের শুরুতে মাসব্যাপী হামের একটি বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। এর আওতায় ছয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন
বেনজীর আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্ত শিশুদের আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা (আইসোলেশন), হাসপাতালগুলোতে পৃথক ওয়ার্ড বা ব্যবস্থা করা এবং ডে-কেয়ার বা স্কুলগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা বাড়াতে হবে। এছাড়া আক্রান্তদের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দ্রুত জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন এবং সারা দেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে সবাই একই রকম চিকিৎসা দেন।
তিনি আরও বলেন, টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক, ওষুধ ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকিও কমানো যাবে।
তাজুল ইসলাম বলেন, নতুন করে টিকা দিলে সাধারণত ১০ দিনের মধ্যে শরীরে ইমিউনিটি তৈরি হয়। আর আগে টিকা নেওয়া থাকলে ৫-৬ দিনের মধ্যেই সুরক্ষা তৈরি হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জুন পর্যন্ত টিকাদান ক্যাম্পেইনের জন্য অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ততদিনে আরও অনেক শিশু সংক্রমিত হতে পারে।
