চট্টগ্রামে কমছেই না হামের প্রকোপ: ৯ ওয়ার্ড হটস্পট, আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করাও
চট্টগ্রামে হামের সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নগরীর নয়টি ওয়ার্ডকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। একই সঙ্গে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন জানান, বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক চমেকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালের এক ২৫ বছর বয়সী ইন্টার্ন চিকিৎসকও হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
তিনি আরও জানান, এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে চমেকের হামের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে ৬ জন রোগীর বয়স ১৪-২৪ বছর।
ডব্লিউএইচও'র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এলাকার সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন মেডিকেল অফিসার (এসআইএমও) খাদিজা আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'নগরীর ২ নম্বর জালালাবাদ, ৪ নম্বর চান্দগাঁও, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী, ১৪ নম্বর লালখান বাজার, ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া, ৩১ নম্বর আলকরণ, ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ও ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'ডব্লিউএইচও'র গাইডলাইন অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। শুধু শিশু নয়, এখন বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছেন।'
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকাদান। একই সঙ্গে জনসমাগম এড়িয়ে চলা, হাঁচি-কাশির সময় স্বাস্থ্যবিধি মানা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে সংক্রমণ বেশি ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে বন্দর-পতেঙ্গা, সদরঘাট- আলকরণ- কোতোয়ালি এবং বাকলিয়া এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
চমেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভর্তি থাকা বেশিরভাগ শিশুর পরিবারের অন্য কোনো শিশুর কয়েকদিন আগে হাম হয়েছিল। পরে একই পরিবারের আরও শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অনেকের শরীরে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। তবে কেউ দ্রুত হাসপাতালে এলে তুলনামূলক দ্রুত সুস্থও হয়ে উঠছে।
এদিকে, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার, চাঁদপুর ও সাতকানিয়া এলাকা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত, এসব স্থান থেকেই বেশি রোগী আসছে।
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, 'হামের প্রাদুর্ভাবের পর শিশু ভর্তি ও মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিলতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি গুরুতর হচ্ছে।'
চমেক হাসপাতালের পরিচালক তসলিম উদ্দিন বলেন, 'বর্তমানে প্রায় ১৩০ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন আইসিইউতে আছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে।'
চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, জেলায় মোট ১ হাজার ৩১৭ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ১ হাজার ২৫২ জন এবং ১৫ উপজেলায় ৬৫ জন রোগী পাওয়া গেছে।
তবে হাসপাতালের হাম ও নিউমোনিয়া জনিত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি তথ্যের কোন মিল নেই।
চিকিৎসকরা বলছেন, ল্যাব কনফার্মেশন ছাড়া আমরা সরাসরি কাউকে হামে মৃত্যুবরণ করেছে বলে রেকর্ড করি না।তবে এর মধ্যে অনেকের হামের উপসর্গ ছিল।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৮ জন এবং উপজেলাগুলোতে কোনো রোগী ভর্তি নেই। এ পর্যন্ত মহানগরে ৩৭ জন রোগী চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। ল্যাব পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত জেলায় ১১৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মহানগরে ৭১ জন এবং উপজেলায় ৪৪ জন রোগী রয়েছে।
সন্দেহজনক হাম নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছয়জন। এর মধ্যে মহানগরে চারজন এবং উপজেলায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা একজন, যিনি উপজেলা এলাকার বাসিন্দা।
নমুনা পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৯১৭টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে মহানগর থেকে ৭১৯টি এবং উপজেলা থেকে ১৯৮টি নমুনা পাঠানো হয়েছে।
