ঢাকার বাইরের রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসায় হামে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে
বাংলাদেশে নিশ্চিত হাম ও সন্দেহজনক সংক্রমণের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং অন্তত ৪৩০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঠানো রোগীদের বড় একটি অংশ গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসে এবং অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটছে রোগের শেষ পর্যায়ে আসা রোগীদের মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও এ-সংক্রান্ত উপসর্গে দেশে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৪৮৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের চিকিৎসকদের জন্য জরুরি প্রশিক্ষণ এবং একটি জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, রাজধানীর বাইরের অনেক রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া হলে সময়মতো অক্সিজেন সহায়তা প্রয়োজন হয়, আর এতে দেরি হলে ফুসফুসের দ্রুত ক্ষতি হতে পারে। তিনি বলেন, 'ভিটামিন এ দেওয়া, পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং অক্সিজেন পর্যবেক্ষণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো ঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না, ফলে রোগীদের অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে।'
ডা. ইসলাম বলেন, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে অন্তত ২৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় ভর্তি হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে রোগী আসার সময়ই বোঝা যায় যে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি, কারণ তখন শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে গেছে।'
তিনি দ্রুত 'ম্যানুয়াল অব ম্যানেজমেন্ট অব মিজলস' প্রণয়ন এবং দেশব্যাপী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। চিকিৎসকদের হালনাগাদ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।' তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে গুরুতর রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব।
দেরিতে হাসপাতালে আসায় বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছর হাম-সংশ্লিষ্ট ৬০ শিশুমৃত্যুর পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে মারা গেছে ৪৮ শিশু। এদের মধ্যে ১৮ জন ঢাকা জেলার এবং বাকি ৩০ জনকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। ঢাকার বাইরের হাসপাতালে মারা গেছে আরও ১২ শিশু।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১১ জনকে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে পাঠানো হয়েছিল। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মারা যাওয়া ১০ শিশুর মধ্যে ৬ জনকে অন্য জেলা থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এতে দেরিতে হাসপাতালে পাঠানো এবং গুরুতর অবস্থায় রোগী আসার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. আসিফ হায়দার জানিয়ছেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঢাকার ভেতরের, আর অধিকাংশই ঢাকার বাইরের এলাকা থেকে গুরুতর অবস্থায় আসে।
তিনি বলেন, 'এসব রোগীর অনেকেরই তাৎক্ষণিক নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হয়।' তিনি আরও জানান, অনেক রোগীকে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পর এখানে পাঠানো হয়েছে। বুধবার দুপুরে যে শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাকেও ঢাকার বাইরে থেকে পাঠানো হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় থেকেই খারাপ অবস্থায় থাকে। ফলে ঢাকায় আনার আগ পর্যন্ত তাদের অবস্থা আরও অবনতি হয়। তিনি বলেন, উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে শুরুতেই চিকিৎসা দেওয়া গেলে অনেক গুরুতর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।
তিনি আরও বলেন, হামের চিকিৎসা জটিল নয়, তবে জটিলতা তৈরি হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। ঢাকার বাইরেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চিকিৎসাসুবিধা রয়েছে, তাই অপ্রয়োজনীয় রোগী স্থানান্তর এড়িয়ে চলা উচিত। আইসিইউ সুবিধা জোরদার করা হলেও মৃত্যুর ঘটনা এখনও ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক অভিভাবক এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে রোগী নিয়ে ঘোরেন, এতে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়। তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো নির্ধারিত চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীকে স্থিতিশীল রাখা।'
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার ক্রমবর্ধমান মৃত্যুকে কর্তৃপক্ষের জন্য 'লজ্জার বিষয়' বলে মন্তব্য করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা। তবে অতিরিক্ত শিশু অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় টিকাদানের হার এখন ১০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, এই কর্মসূচি দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রবণতা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
