থ্যালাসেমিয়া শনাক্তকরণ: শুধু ‘বিয়ের আগে পরীক্ষা’ নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত জাতীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া এখন একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বহু মানুষ নিজের অজান্তেই এই রোগের বাহক হিসেবে জীবন কাটান। তারা নিজেরা অসুস্থ নন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। কিন্তু দুইজন বাহক যদি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে তাদের সন্তানের ক্ষেত্রে গুরুতর থ্যালাসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে ভয় দেখানো নয়, বরং সচেতন করা।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে 'বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা' করার কথা প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় সামাজিক অস্বস্তি ও মানসিক চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে 'বাহক' শব্দটি অনেক পরিবার ভুলভাবে গ্রহণ করে। অথচ বাহক মানেই রোগী নয়। একজন বাহক কর্মজীবন বা ব্যক্তিগত জীবনে কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তাই থ্যালাসেমিয়া শনাক্তকরণকে শুধুমাত্র বিয়ের সঙ্গে না জড়িয়ে জীবনের বিভিন্ন ধাপে স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় থ্যালাসেমিয়া শনাক্তের সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ উপায় হতে পারে সিবিসি (CBC) পরীক্ষাভিত্তিক প্রাথমিক স্ক্রিনিং বা যাচাই। বর্তমানে উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা পর্যন্ত অনেক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিবিসি পরীক্ষা সহজলভ্য। এই পরীক্ষায় যদি দেখা যায় রক্তের এমসিভি ও এমসিএইচ এর মাত্রা কম, অথচ শরীরে আয়রনের অভাবের কোনো স্পষ্ট কারণ নেই, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত। এরপর এইচবি ইলেকট্রোফোরেসিস (Hb Electrophoresis) বা এইচপিএলসি পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
এখানে একটি বড় সমস্যা হলো—বাংলাদেশে অনেক মানুষকে অকারণে 'রক্তশূন্যতা' ভেবে বছরের পর বছর আয়রন খাওয়ানো হয়। অথচ তাদের প্রকৃত সমস্যা হতে পারে থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বা বাহক অবস্থা। এর ফলে সঠিক রোগ ধরা পড়ে না, উল্টো অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা চলতে থাকে। তাই চিকিৎসকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।
শুধু বিয়ের আগে নয়; স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরির স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা গর্ভাবস্থার প্রথম দিকেও থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং করা যেতে পারে। বিশেষ করে এএনসি বা গর্ভকালীন সেবাকেন্দ্রগুলোকে স্ক্রিনিং হাব বা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। গর্ভবতী মায়ের রিপোর্টে বাহক হওয়ার সন্দেহ দেখা দিলে তখন স্বামীর পরীক্ষাও করা যেতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় সামাজিক চাপ কমবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এইচবিই এবং এইচবিই-বিটা থ্যালাসেমিয়া (HbE-beta Thalassemia) একটি বড় সমস্যা। অনেক পরিবারের শিশুরা নিয়মিত রক্ত নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে এখনো নির্ভরযোগ্য জেলাভিত্তিক থ্যালাসেমিয়া রেজিস্ট্রি বা রোগী তালিকা নেই। ফলে কোন এলাকায় রোগীর হার বেশি, কোথায় স্ক্রিনিং প্রয়োজন, কিংবা কোথায় রক্ত সঞ্চালন সুবিধা বাড়ানো দরকার—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আরেকটি বড় সংগ্রাম হলো নিরাপদ রক্তের প্রাপ্যতা। নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল (Transfusion-dependent) রোগীদের জন্য শুধু রক্ত পেলেই হয় না; আদর্শগতভাবে তাদের জন্য লিউকো-রিডিউসড (Leukoreduced) বা লিউকো-ফিল্টার্ড (Leuko-filtered) রক্ত প্রয়োজন। কারণ সাধারণ রক্তে থাকা শ্বেত রক্তকণিকা বারবার শরীরে প্রবেশ করলে জ্বর, ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন এবং সেনসিটাইজেশন (Sensitization)-এর ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এই লিউকো-ফিল্টার এখনো সবার নাগালের মধ্যে নেই। সরকারি ভর্তুকি না থাকায় অনেক পরিবারকে বাড়তি খরচ বহন করতে হয়, আবার অনেকে এই সুবিধাই পান না।
এছাড়া নিয়মিত রক্ত নেওয়ার কারণে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে যায়, যা হৃৎপিণ্ড, লিভার ও হরমোনজনিত জটিলতা তৈরি করতে পারে। এটি প্রতিরোধে আয়রন চিলেশন থেরাপি (Iron chelation therapy) প্রয়োজন হলেও তা অনেক পরিবারের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
অনেকেই মনে করেন বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলেই থ্যালাসেমিয়া পুরোপুরি সেরে যায়। বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা। ডোনার ম্যাচিং, এইচএলএ টাইপিং, ইনফেকশন কন্ট্রোল এবং পরবর্তী পরিচর্যার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ রোগীর জন্য এই চিকিৎসা এখনো সহজলভ্য নয়। ফলে অধিকাংশ পরিবার এখনো নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন নির্ভর চিকিৎসার ওপরই নির্ভরশীল।
তাই বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি বাস্তবমুখী জাতীয় পরিকল্পনা। কিন্তু এখানে বড় সংকট হলো নির্ভরযোগ্য জেলাভিত্তিক রোগী ও বাহক তালিকা না থাকা। কোন জেলায় রোগীর সংখ্যা বেশি, কোথায় রক্তের চাহিদা বেশি, কোথায় এইচবিই ট্রেইট বা বিটা-থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বেশি—এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন। জাতীয় পর্যায়ে যখন তথ্যের ঘাটতি থাকে, তখন নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনাও অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে।
এই তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক বাস্তব সমস্যা তৈরি হয়। কোথায় থ্যালাসেমিয়া সেন্টার দরকার, কোথায় এইচপিএলসি মেশিন বসানো জরুরি, কোন জেলার ব্লাড ব্যাংক শক্তিশালী করা প্রয়োজন, কোথায় কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে হবে কিংবা কোন এলাকায় বিশেষ সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো দরকার—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো শক্ত ভিত্তি পাওয়া যায় না। ফলে যেখানে রোগী বেশি, সেখানে অনেক সময় পর্যাপ্ত সেবা পৌঁছায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—থ্যালাসেমিয়াকে সামাজিক কলঙ্ক বানানো যাবে না। 'বাহক' শব্দটিকে ভয় বা অযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করলে মানুষ পরীক্ষা করতে ভয় পাবে। বরং আমাদের বলতে হবে, 'থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়া কোনো রোগ নয়; এটি জানার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পরিবার পরিকল্পনা আরও সচেতনভাবে করা সম্ভব।'
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য দামী প্রযুক্তির চেয়ে বেশি প্রয়োজন সহজ স্ক্রিনিং ব্যবস্থা, সঠিক কাউন্সেলিং, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন সুবিধা এবং মানুষের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তবেই আগামী প্রজন্মকে এই কষ্টের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ), কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কুমিল্লা।
