আলোচনার দাবি অস্বীকার ইরানের, সরবরাহ-উদ্বেগে কমেও ফের কিছুটা বাড়ল তেলের দাম
পারস্য উপসাগরে যুদ্ধ থামানো নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি নাকচ করে তেহরানের এই বিবৃতির পরেই বিশ্ববাজারে ক্রুড তেলের সরবরাহে টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে আগেরদিন কমার পর মঙ্গলবার লেনদেনের শুরুতেই ফের বাড়তে শুরু করেছে তেলের দাম।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.০৬ ডলার বা ১.১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার। পাল্লা দিয়ে ১.৫৮ ডলার বা ১.৮ শতাংশ বেড়েছে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটও (ডব্লিউটিআই)—বর্তমানে এর দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৯.৭১ ডলার।
অথচ সোমবার ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিন স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি অজ্ঞাতপরিচয় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে 'ফলপ্রসূ' আলোচনার দাবিও করেন তিনি। ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, দুই দেশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ইতিবাচক বার্তার জেরে সোমবার তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ পড়ে গিয়েছিল।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তে তেলের দাম থেকে 'যুদ্ধকালীন বাড়তি দরের' বোঝা অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, 'আজকের এই সামান্য উত্থান আসলে অস্থির বাজারে ফের থিতু হওয়ার চেষ্টা। লগ্নিকারীরা জানেন, মিসাইল হামলা আপাতত বন্ধ থাকলেও হরমুজ প্রণালি এখনও পুরোপুরি বিপদমুক্ত নয়।'
যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কার্যত থমকে গেছে। যদিও সোমবার ভারতগামী দুটি ট্যাঙ্কার এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেছে বলে জানা গেছে।
আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগের দাবিকে 'আর্থিক বাজারকে প্রভাবিত করার কৌশল' বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। উল্টো ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্যকে 'সেকেলে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই' বলেও কটাক্ষ করেছে তারা।
আর্থিক পরামর্শদাতা সংস্থা ম্যাকোয়ারি এক বার্তায় জানিয়েছে, ট্রাম্পের ঘোষণায় উত্তেজনা কিছুটা কমলেও তেলের দাম ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের নিচে নামার সম্ভাবনা কম। বরং হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তা ফের ১১০ ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে পারে।
ময়াকোয়ারির সতর্কবার্তা, এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত এই নৌপথ বন্ধ থাকলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৫০ ডলারেও পৌঁছে যেতে পারে।
রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি বলছে, যুদ্ধে এ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় ইসফাহান শহরের একটি গ্যাস কোম্পানির অফিস ও প্রেশার রিডাকশন স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া খোররমশাহরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস পাইপলাইনেও আঘাত হেনেছে মিসাইল।
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সমুদ্রে থাকা রুশ ও ইরানি তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে ওয়াশিংটন। শিল্প সূত্রে জানা গেছে, এর পরেই ভারতীয় শোধনাগারগুলোকে চড়া প্রিমিয়ামে তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল সোমবার বলেছেন, প্রয়োজনে জরুরি মজুত ভান্ডার থেকে আরও তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে।
হিউস্টনে আয়োজিত এক সম্মেলনে তেল সংস্থার নির্বাহী ও জ্বালানি মন্ত্রীরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়বে। যদিও মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এই সংকটকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে নারাজ।
