উচ্চ–বাজির যুদ্ধে উত্তেজনা বাড়ানোর ইচ্ছাই ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র
স্নায়ুযুদ্ধের সময় কূটনীতির মূলভিত্তি ছিল 'ব্রিঙ্কম্যানশিপ'—অর্থাৎ, একটি দেশকে যুদ্ধের কিনারায় নিয়ে যাওয়া, কিন্তু পুরোপুরি সংঘাতের অতলে ঠেলে না দেওয়া। কিন্তু বর্তমানের অস্থির বিশ্বে—যেখানে রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় শক্তির সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গেছে এবং যুদ্ধাস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে—সেখানে এই সীমা যেন ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। এই সপ্তাহে বিশ্ব যেন সেই সীমা অতিক্রমও করে ফেলেছে, এবং হঠাৎ করেই এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পতনের মধ্যে প্রবেশ করেছে।
ইরান যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু পেন্টাগন আরও ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সামরিক বরাদ্দ চাচ্ছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলারে পৌঁছেছে। রাস লাফফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি—বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুদ্ধের আগুনে। এটি ফের পুরোপুরি চালু হতে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে, যার বার্ষিক ক্ষতি ২০ বিলিয়ন ডলার। বাহরাইন থেকে শুরু করে আবু ধাবি পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য তেল স্থাপনাও ইরানের স্বল্প খরচে তৈরি ড্রোনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি—শুধু ইরানেই ১৮ হাজার আহত ও ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের হামলা, অন্তর্ঘাত ও নানান নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত তেহরানের শাসনগোষ্ঠী, বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিল—তাদের ওপর হামলা হলে পাল্টা জবাব দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের এমন প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত হয়েছেন বলে মনে হয়। যদিও দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি (যুদ্ধ শুরুর দিন নিহত) গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই বলেছিলেন: "আমেরিকানদের জানা উচিত, যদি তারা যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে এটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে।"
ইরান আরও জানিয়েছিল, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে সংঘাত নতুন পর্যায়ে যাবে। নিহত ইরানি নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই বার্তা স্পষ্টভাবে দিয়েছিলেন এবং তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানো তাদের জাতীয় স্বার্থ নয়। বুধবার যখন ইরান রাস লাফফানে পাল্টা হামলা চালায়, তখন লারিজানিকে "শহীদের মর্যাদায়" দাফন করা হচ্ছিল।
ইরানি শাসনব্যবস্থা যুদ্ধ বাড়াতে কোনো দ্বিধা করে না; বরং এই প্রস্তুতিই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এক ইরানি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন: "আরও কিছু কার্ড প্রস্তুত আছে, সঠিক সময়ে সেগুলো ব্যবহার করা হবে।" এটি সম্ভবত উপসাগরীয় অঞ্চলের লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর প্রতি ইঙ্গিত—যেগুলো এই অঞ্চলের নাজুক পানি সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
ইরানের নেতৃত্ব, যাদের হারানোর কিছু নেই, ভয়কে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। উদাহরণ হিসেবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মতো ইউরোপীয় নেতাদের প্রধান উদ্বেগ হলো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা এবং ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে, দেশটি থেকে শরণার্থীদের ঢল। ইরানি ওই কর্মকর্তা ইউরোপকে সীমান্ত বন্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে নৌবাহিনী পাঠানো-ও ইউরোপীয় নেতাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রাম্প এখন হয়তো "সম্মিলিত প্রচেষ্টা" চাইছেন, কিন্তু ইউরোপকে এমন এক যুদ্ধে জড়াতে বলা হচ্ছে, যা শুরুর সময় তাদের সঙ্গে পরামর্শই করা হয়নি এবং যার পরিণতি ইইউ নেতারা আগেই অনুমান করেছিলেন।
যুদ্ধের হালচাল দেখে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প "আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ" হয়ে উঠছেন এমনটাই বলা হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর বিরক্ত—যাদের তিনি ধীরগতি ও অকৃতজ্ঞ মনে করেন—এবং ক্ষুধ তার নিজস্ব 'মাগা' আন্দোলনের সমর্থকদের ওপরও। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গাবার্ডের ওপর ক্ষুব্ধ, কারণ তিনি কংগ্রেসে বলেছেন ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনর্গঠন করেছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স-এর নীরবতাও অনেক কিছু ইঙ্গিত করছে।
এমনকি ইউরোপের ডানপন্থী জনপ্রিয় নেতাদের মধ্যেও তার সমর্থন কমছে। জার্মানির অলটারনেটিভ ফর ডয়চল্যান্ড-এর সহ-নেতা টিনো চ্রুপেল্লা বলেছেন, "ট্রাম্প শান্তির প্রেসিডেন্ট হিসেবে শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধের প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠবেন।"
আরও বড় সমস্যা তৈরি করেছে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জোট, যার ভিত্তিতে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করেছে। ট্রাম্প প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে না জানিয়েই ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছিলেন—যা উপসাগরীয় দেশগুলো এড়াতে বলেছিল, কারণ এতে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসবে।
ট্রাম্প বলেন, "আমি তাকে বলেছিলাম এটা না করতে… আমরা ভালোভাবে সমন্বয় করি। তবে কখনো কখনো সে কিছু করে ফেলে, আর আমি যদি পছন্দ না করি, তখন বলি—এটা হবে না।" কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো দেখা গেল, ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু তালিকা যুক্তরাষ্ট্রের থেকে ভিন্ন। এর আগে ইসরায়েল তেহরানের চারটি বড় জ্বালানি ডিপোতে বোমা হামলা চালায়, যার ফলে এমন অগ্নিকাণ্ড হয় যে পরদিন শহরে কালো বৃষ্টির মতো ছাই পড়ে।
যুদ্ধ বন্ধের কূটনীতিও কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসে এখন একমাত্র 'বাসিন্দা' একটি তিন পা-ওয়ালা কুকুর। লন্ডনের কূটনৈতিক আলোচনায় সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে হতাশ আলোচনা চলছে, কিন্তু ট্রাম্প গ্রহণ করতে পারেন এমন কোনো পথ কেউ স্পষ্টভাবে দেখাতে পারছে না।
@যুদ্ধ কীভাবে শেষ হতে পারে?
এক্ষেত্রে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমটা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, যার শেষে ইরান হয়তো আত্মসমর্পণ করবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ট্রাম্পের একতরফা বিজয় ঘোষণা। আর সবশেষটি হলো বড় বা ছোট কোনো চুক্তি—আঞ্চলিক বা দ্বিপাক্ষিক—যা যুদ্ধ বন্ধ করবে।
যুক্তরাজ্যের সাবেক কূটনৈতিক কর্মকর্তা সিমন ম্যাকডোনাল্ড মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিজয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, "আমার যা মনে হয়, ইরানে যে দেশটি তাদের লক্ষ্য অর্জন করছে, তা হলো ইসরায়েল। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সারাজীবন ইরানে আক্রমণ নিয়ে আচ্ছন্ন ছিলেন। তার অফিসে উইনস্টন চার্চিলের প্রতিকৃতি ছিল—চার্চিলই তার রোল মডেল।
"চার্চিল যেমন ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি জার্মানির হুমকি দেখেছিলেন, তেমনি নেতানিয়াহু ইরানকে দেখেছেন। এটি তার দীর্ঘ পরিকল্পনার পরিণতি। এটি কাজ করতেও পারে… ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।"
দ্বিতীয় সম্ভাবনায়, ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করে সরে দাঁড়াতে পারেন, দাবি করতে পারেন যে তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস বা দুর্বল করেছেন। ইতোমধ্যেই তিনি দাবি করেছেন ইরানের নৌবাহিনী, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিরাপত্তা কাঠামো ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই অবস্থায়, ইসরায়েল ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানোর জন্য চাপ দিলেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া তেল আবিবের সামনে অন্য উপায় তেমন নেই। কিন্তু, তাতে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান অজানা থাকবে, মার্কিন আকাশ শক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট অনুভুব হবে, এবং প্রায় ২১ মাইল প্রশস্ত হরমুজ প্রণালি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণই থাকবে। ইরানের জনগণ তখন নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করবে।
তবে এই সম্ভাবনা নির্ভর করছে ইরান এই 'প্রতীকী' বিজয় মেনে নেবে কিনা তার ওপর। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের গবেষক আসলি আয়দিনতাসবাস বলেন: "ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু তা শাসন পরিবর্তন নয়—বরং আরও কট্টর, জাতীয়তাবাদী ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-কেন্দ্রিক শাসন কাঠামো তৈরি হয়েছে।"
এটি গুরুত্বপূর্ণ যে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি-ও মনে করেন, লারিজানির হত্যাকাণ্ড শান্তির সম্ভাবনাকে পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, "যারা নির্মম হামলা ও হত্যার শিকার হচ্ছেন, তারাই দেশের জন্য লড়াই করার পাশাপাশি সম্মানজনক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে আগ্রহী ছিলেন।"
শেষ সম্ভাবনা হলো উত্তেজনা হ্রাস এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা। এই শান্তি হতে পারে আগেভাগেই সব পক্ষকে পূর্ণ চিত্র দেখিয়ে—যাকে ব্রিটেনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাথন পাওয়েল 'ফুল ব্যালে' বলেন—অথবা ধাপে ধাপে সমঝোতার মাধ্যমে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন, একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিয়েছেন—আঞ্চলিক অনাগ্রাসন চুক্তির আওতায় পারমাণবিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
তবে তাদের জন্য বড় হুমকি কে, ইরান নাকি ইসরায়েল— এনিয়ে বিভক্ত উপসাগরীয় দেশগুলো। তবে ইরানের আক্রমণাত্মক কৌশল উপসাগরীয় অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলায়, তারা এই বিতর্কে সমর্থন হারাচ্ছে—এমনকি কাতার ও তুরস্কের মতো দেশেও, যারা ইরানকে আলোচনায় আনতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভূমিকা নিয়েও উপসাগরীয় দেশের শাসকদের পুনর্বিবেচনা করার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, "ইরান যদি মনে করে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিক্রিয়া জানাতে অক্ষম, তাহলে তারা ভুল করছে। আগে যে সামান্য বিশ্বাস ছিল, সেটিও এখন সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।"
কিন্তু, পারস্পরিক বিশ্বাস না থাকলে ধ্বংসযজ্ঞই চলতে থাকবে, এবং ইরান নতুন বছর নওরোজেও পুনর্জাগরণের কোনো আশা ছাড়া প্রবেশ করবে।
