খারগ দ্বীপের তেলক্ষেত্রে ট্রাম্পের হামলার হুমকির পরও পিছু হটতে নারাজ ইরান
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা বন্ধ না করলে ইরানের প্রধান তেলক্ষেত্র খারগ দ্বীপের অবকাঠামোতে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাতের কারণে বাজার সংকট, তার ওপর এই হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করতে পারে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, খারগ দ্বীপে থাকা সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলো 'সম্পূর্ণ ধ্বংস' করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রণালি থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার (৩০০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপ থেকেই ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় খারগের তেল অবকাঠামোতে আঘাত করা হয়নি। তবে ট্রাম্প লিখেছেন, 'ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলে বাধা দেয়, তবে আমি তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।'
যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর মুখে ইরানও নিজেদের অনড় অবস্থান পরিষ্কার করেছে। খারগের ক্ষয়ক্ষতিকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে তারা আরও শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু অংশকে তাদের 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক মুখপাত্র বলেন, 'আমরা আমিরাতের নেতাদের জানিয়ে দিচ্ছি যে, আমিরাতের কিছু শহরে লুকিয়ে থাকা মার্কিন সামরিক আশ্রয়কেন্দ্র, বন্দর ও ডক থেকে যে আমেরিকান ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে, সেসব উৎসে আঘাত হেনে নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষা করাকে ইরান নিজেদের বৈধ অধিকার মনে করে।'
এক বিবৃতিতে বেসামরিক প্রাণহানি এড়াতে আমিরাতের বাসিন্দাদের বন্দর, ডক ও মার্কিন সামরিক আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে দূরে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আইআরজিসি।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার (১৪ মার্চ) ইরান থেকে দেশটিতে ৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৩টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান মোট ২৯৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৬০০টি ড্রোন ছুড়েছে।
আঞ্চলিক সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, পর্দার আড়ালে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কারণ যে যুদ্ধ তারা শুরু করেনি বা সমর্থনও করেনি, তার অর্থনৈতিক ও সামরিক মাশুল এখন তাদেরই গুনতে হচ্ছে।
হামলা বাড়লেও মাথা নোয়াচ্ছে না ইরান
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তারা আরও আধুনিক অস্ত্র, বিশেষ করে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়াবে।
আইআরএনএ নিউজ এজেন্সিকে এক জ্যেষ্ঠ প্রাদেশিক গভর্নর জানিয়েছেন, মার্কিন হামলার পরও খারগ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
শুক্রবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, মার্কিন নৌবাহিনী 'খুব শিগগিরই' হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিয়ে পার করবে। উল্লেখ্য, বিশ্বের জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে যায়।
নিহত বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে এই কৌশলগত জলপথটি বন্ধই রাখা উচিত।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, খারগে হামলার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের দেশের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে কোনো আঘাত এলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করা তেল কোম্পানিগুলোর স্থাপনাতেও পাল্টা আঘাত হানা হবে।
শিল্প ও বাণিজ্য সূত্র জানিয়েছে, শনিবার আমিরাতের অন্যতম প্রধান ফুজিয়ারা আমিরাতে আগুন লাগার পর সেখানে কিছু তেল লোড করার কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। আমিরাতের মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, একটি ড্রোন প্রতিহত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে এই আগুন লাগে, তবে কেউ হতাহত হয়নি।
ট্যাঙ্কারট্র্যাকার.কম এবং কেপলার-এর তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর আগে তেল উৎপাদন বাড়ানো ইরান এখনো প্রতিদিন ১১ লাখ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে। খারগ থেকে রপ্তানি হওয়া এই তেলের বড় অংশই যায় বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ চীনে।
যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে ট্রাম্পের বারবার পাল্টানো মন্তব্যের কারণে তেলের দামেও ব্যাপক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণ দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ দ্রুতই একটি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও শেয়ার বাজারে।
বাড়ছে প্রাণহানি
ইরাকের নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, শনিবার বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভবনটি থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে লেবাননের হিজবুল্লাহ মিলিশিয়ার সঙ্গে মিলে ইসরায়েলে আরও হামলা চালিয়েছে বিপ্লবী গার্ড।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, শনিবার দক্ষিণ লেবাননের বোরজ কালাউইয়া শহরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন।
ইরানের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশের মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসহ একাধিক স্থানে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ব্যবসা কেন্দ্র আইসিডি ব্রুকফিল্ড প্লেস-এর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের ভাড়াটেদের এক বার্তায় একটি ঘটনা ঘটার কথা জানিয়েছে, তবে বিস্তারিত কিছু বলেনি। এর আগে দুবাইয়ের মিডিয়া অফিস জানিয়েছিল, সফলভাবে প্রতিহত করা একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ মধ্য দুবাইয়ের একটি ভবনে আঘাত হেনেছে, তবে কোনো আগুন বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। নির্দিষ্ট স্থানের নামও জানানো হয়নি।
দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধে ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার বেশিরভাগই ইরানে। তবে লেবাননে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলেও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরাকে একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৬ জন ক্রু সদস্যের মৃত্যুসহ মার্কিন বাহিনীও বেশ কিছু হতাহতের শিকার হয়েছে।
