ইরান যুদ্ধের ধাক্কা লাগল বেইজিংয়েও, কোভিডের পর এই প্রথম প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলো চীন
চীনের অর্থনীতি চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অভ্যন্তরীণ দুর্বল চাহিদা ও ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতার মধ্যে দেশটি কোভিড-১৯ মহামারির পর প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো বুধবার জানায়, ৩০ জুন শেষ হওয়া দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল ৪.৫ শতাংশ।
চলতি বছরের জন্য চীনের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ। ১৯৯০ দশকের শুরু দিকের পর এবারই প্রথম সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে চীন। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি দেশটির সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে,চীনের রপ্তানি শক্তিশালী থাকলেও দেশের ভেতরে ভোক্তা খরচ কমে যাওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবও চীন এড়াতে পারেনি।
নাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, 'দেশীয় চাহিদা নেই, পুরো অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর—দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই নয়।'
বছরের প্রথমার্ধে শিল্প ও আবাসন খাতে চীনের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ কমেছে ৫.৭ শতাংশ আর আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমেছে ১৮ শতাংশ।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেমিকন্ডাক্টর ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশের শক্তিশালী রপ্তানির কারণে রপ্তানি ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অর্থনীতি এখন দুই ধারায় চলছে—একদিকে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি শক্তিশালী, অন্যদিকে দেশীয় বাজারে দৈনন্দিন পণ্যের চাহিদা দুর্বল।
ইউওবির গ্রেটার চায়না অঞ্চলের অর্থনীতিবিদ উয়েই চেন হো বলেন, যদিও একটি বড় আকারের প্রণোদনা প্যাকেজের সম্ভাবনা কম বলে মনে হচ্ছে, ভোগ ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাছাইকৃত এবং লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ চীনের অর্থনৈতিক গতিকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুনে চীনে খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ শতাংশ বেড়েছে। মে মাসে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর প্রথমবারের মতো এ সূচক কমে গিয়েছিল। জুনে তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
ইরান যুদ্ধের সময় জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় চীনে দীর্ঘদিনের মূল্যপতনের চাপ কিছুটা কমেছে। মে মাসে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকলে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম আরও বাড়তে পারে, যা উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জুলাইয়ের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে পণ্যমূল্যের অস্থিরতা বাড়বে, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে এবং বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সেন্টার, চিপ ও বিদ্যুৎ সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনের রপ্তানি বাড়ছে। ম্যাককোয়ারির তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে দেশটির রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই এসেছে চিপ, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ ও বিদ্যুৎ সরঞ্জাম থেকে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দেশীয় চাহিদা শক্তিশালী না হলে শুধু রপ্তানির ওপর নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জুনে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে ১২৫.৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। যদিও চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষ বলেছে, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে দেশটি আমদানিও বাড়াতে থাকবে।
এদিকে মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২১ সালের শুরুর পর সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ জুলিয়ান ইভানস-প্রিচার্ড বলেন, 'প্রত্যাশামতো প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে, তবে সাম্প্রতিক তথ্য ভোক্তা ব্যয় স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।'
তার মতে, সরকার এবার লক্ষ্যমাত্রার নিচের জিডিপি প্রকাশ করে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি নমনীয়তা দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, 'সরকার সম্ভবত অতিরঞ্জিত প্রবৃদ্ধির হিসাব থেকে সরে এসে লক্ষ্যমাত্রার নিম্নসীমার কাছাকাছি প্রকৃত প্রবৃদ্ধি প্রকাশ করতে প্রস্তুত। তাই এই তথ্যকে অর্থনীতি হঠাৎ করে তীব্রভাবে মন্থর হয়ে গেছে—এমন সংকেত হিসেবে দেখা উচিত নয়।'
