'জেন জি' নিয়ে দুনিয়াজুড়ে এত আগ্রহের কারণ কী?
খবর পড়লেই মনে হয়, 'জেন জি' বা জেনারেশন জি যেন এক অদ্ভুত গ্রহের বাসিন্দা! এই তো কয়েক দিনের মধ্যেই একের পর এক গবেষণায় দাবি করা হলো জেন জি-রা আকণ্ঠ মদ পান করতে ভালোবাসে, তারা জেন্ডার পরিচয়ের ক্ষেত্রে বেশ সাবেকি ধ্যানধারণা পোষণ করে, তারা 'চায়নাম্যাক্সিং' (চীনা জীবনযাপন) শুরু করেছে, একা বসে খেতে পছন্দ করে, আবার শারীরিক সৌন্দর্য্যের মতোই পরিবেশ রক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেয়।
গুগলে শুধু 'জেন জি' লিখে খুঁজলেই লাখ লাখ আর্টিকেল হাজির হবে। তাদের আর্থিক অবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাস আর শখ কী নেই সেখানে! ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গবেষণা, বিশ্লেষণ আর জরিপের শিকার সম্ভবত এই প্রজন্মটাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জেন জি-কে নিয়ে আমাদের এত মাতামাতি কেন?
অনেকের মতেই, এর পেছনে ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার বড় হাত রয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, তারাই জেন জি। এই প্রজন্মটিই শৈশব থেকে প্রযুক্তির সাগরে পুরোপুরি ডুবে বড় হয়েছে, যা তাদের আগের প্রজন্মগুলো থেকে আলাদা করে তুলেছে।
লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির সাবেক পরিচালক পল রেডমন্ড, যিনি এখন প্রজন্মের বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন, বলেন, 'এরাই প্রথম প্রজন্ম যারা প্রযুক্তির চাদরে মোড়া পরিবেশে বড় হচ্ছে। কারও কারও তো জন্মের আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোফাইল তৈরি হয়ে গেছে!'
তিনি আরও বলেন, 'এ কারণে তাদের নিয়ে সবার এত কৌতূহল। তারা অন্য প্রজন্মের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা আচরণ দেখাচ্ছে।'
কাজের প্রতি জেন জি-র দৃষ্টিভঙ্গি (তারা ঘন ঘন চাকরি বদলায়) এবং তাদের কেনাকাটার ধরন তাদের নিয়ে গবেষণা ও জরিপের বড় রসদ জোগায়। চাকরিদাতারা জানতে চান কীভাবে তাদের নিয়োগ দেওয়া যায়, আর কোম্পানিগুলো জানতে চায় কীভাবে তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করা যায়।
এর ফলেই জন্ম নিয়েছে জেন জি-নির্ভর নানা মার্কেটিং এজেন্সি। তারা জানে, ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া জেনারেশন এক্স-এর হাতে এখন বড় কোম্পানিগুলোর চাবিকাঠি, আর তারা এই তরুণদের মন বুঝতে মরিয়া।
সিড মার্কেটিং এজেন্সির ব্র্যান্ড ও গ্রোথ ডিরেক্টর জোয়ানা অলকক বলেন, 'এই প্রজন্ম সোশ্যাল ইন্টারনেট, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগ, মহামারি এবং এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে বড় হয়েছে। এই বিষয়গুলো তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি, মতামত তৈরি করা এবং ব্র্যান্ড বাছাইয়ের ধরন একেবারে পাল্টে দিয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে চাইছে এই পরিবর্তনশীল সংস্কৃতিতে কীভাবে প্রাসঙ্গিক থাকা যায়।'
তবে এই তথ্য পাওয়ার মরিয়া চেষ্টার কারণে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য ভুয়া জরিপ ও অর্থহীন পোল। জোয়ানা বলেন, 'আমার ফোনে জেন জি নিয়ে খবরের জন্য গুগলের অ্যালার্ট দেওয়া আছে। প্রতিদিন শত শত ইমেইল আসে। আমাদের অফিসের অর্ধেক কর্মীই জেন জি, তাই আমরা খুব ভালো করেই বুঝি যে এই জরিপের অনেক কথাই ডাহা মিথ্যা।'
থ্রেড মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জেঙ্ক ওজ বলেন, জেন জি-কে নিয়ে এত বিশ্লেষণের সহজ কারণ হলো তাদের বিশ্লেষণ করা সহজ। ছোটবেলা থেকেই অনলাইনে তাদের সরব উপস্থিতির কারণে আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে তারা নিজেদের সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য দুনিয়াকে দিয়ে রেখেছে।
তিনি বলেন, 'আগের প্রতিটি প্রজন্মের ক্ষেত্রেও শুরুতে এমন আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু জেন জি-র ক্ষেত্রে এই আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে, কারণ তারা কয়েক দশক ধরে মানুষের কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি দিচ্ছে আর তা হলো - সরাসরি উৎস থেকে পাওয়া রিয়েল-টাইম ডেটা।'
তিনি আরও যোগ করেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে এরাই হবে সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে বেশি খরচ করা প্রজন্ম। মিলেনিয়ালদের (১৯৮১-১৯৯৬) সাথে মিলিয়ে বিশ্বের মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের মালিক হবে তারা। তাই এই মাতামাতির পেছনে আসলে টাকার খেলাটাই মুখ্য।
অন্যদিকে অনেকেই বলছেন, তরুণদের নিয়ে সমাজের মাতামাতি নতুন কিছু নয়। কিংস কলেজ লন্ডনের পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ববি ডাফি বলেন, জেন জি-কে নিয়ে এই আগ্রহ এখন রীতিমতো 'হিস্টিরিয়া' বা বাতিকে রূপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, 'প্রতিটি প্রজন্মই মনে করে বর্তমান তরুণ প্রজন্মটাই বুঝি সবচেয়ে খারাপ। এর আগে মিলেনিয়ালরা সবচেয়ে তরুণ বয়স্ক প্রজন্ম ছিল এবং তাদের অ্যাভোকাডোপ্রীতি ও মাথার ওপর খোঁপা করা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা শুনতে হয়েছে।'
'এখন সেই দায়ভার জেন জি-র কাঁধে এসে পড়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ, কারণ আমরা এমন এক সোশ্যাল মিডিয়া যুগে আছি যা কেবল সংঘাতই বাড়ায়।'
তার মতে, জেন জি-র কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকলেও, অনেক কিছুই আসলে মানুষের বয়সের স্বাভাবিক চক্র,বয়স বাড়লে যা হয়তো বদলে যাবে ।
ডাফি বলেন, 'যেমন, জেন জি-র ক্ষেত্রে দেরিতে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কথাটি সত্য। তারা বেশি দিন বাবা-মায়ের সাথে থাকছে, বেশি সময় ধরে পড়ালেখা করছে, দেরিতে বিয়ে করছে এবং দেরিতে সন্তান নিচ্ছে।'
'তবে গণমাধ্যমে জেন জি-কে নিয়ে যা দেখানো হচ্ছে, তার বেশিরভাগই মার্কেটিংয়ের আবোলতাবোল কথা।'
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল যুগে 'জেন জি'-র মতো তকমাগুলো বেশ আকর্ষণীয়। সোশ্যাল মিডিয়া বা খবরের শিরোনাম লেখকদের জন্য খুব দ্রুত একটা ভাবমূর্তি তুলে ধরার এটি দারুণ এক উপায়।
ডাফি মনে করেন, ভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে দূরত্বের কারণেই জেন জি-কে নিয়ে নানা মিথ ও বাঁধাধরা ধারণা তৈরি হচ্ছে। পরিবার ছাড়া বাইরের জগতে তাদের যোগাযোগ খুব কম।
তিনি বলেন, 'আমাদের ডিজিটাল জীবন এখন অনেক আলাদা। একেক প্রজন্ম একেক প্ল্যাটফর্মে ভিন্ন ভিন্ন কাজ করছে। ফলে পরিবারের বাইরে প্রজন্মের মধ্যে এখন বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, আর ঠিক সেখানেই জন্ম নিচ্ছে নানা ভুল ধারণা।'
