‘মানুষ যেন না ভাবে পরিবর্তন বৃথা গেছে’: ভোট দিয়ে যা বললেন ‘জেন-জি’ ভোটাররা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রথমবারের মতো নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন 'জেন-জি' বা এই প্রজন্মের তরুণ ভোটাররা। প্রথমবার ভোট দিতে পেরে তারা যেমন আনন্দিত, তেমনি নতুন সংসদ ও সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বী। সব ক্ষেত্রে নায্যতা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চাইছেন এই তরুণরা।
উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া হোসাইন মোহাম্মদ মারুফ ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের এইচএসসি শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। মোহাম্মদপুর কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে ভোট দিয়ে বের হওয়ার সময় তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মারুফ বলেন, 'প্রথমবার ভোট দিলাম, ভোট নিয়ে অনেক ধরনের গল্প শুনেছি। কিন্তু আমার কাছে প্রসেসটা বেশ সহজ ও নিঞ্ঝাট মনে হলো।'
কী গল্প শুনেছেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ভোট খুঁজে পাওয়া যায় না, কেন্দ্রে গেলে বলে আপনার ভোট হয়ে গেছে। গণ্ডগোল হয়, এসব শুনতাম। আমি কিন্তু সেরকম দেখলাম না। আমি ভোটারলিস্টে আমার নাম ও ছবি দেখেছি।'
ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে এই তরুণ বলেন, 'আমি এমন একটি সরকার চাই, যে সরকার সকলের রাইটস [অধিকার] নিশ্চিত করবে। স্বাধীনভাবে চিন্তা ও চলাফেরা করতে পারবে। করাপশন [দুর্নীতি] হবে না। ইয়ুথ এমপাওয়ারমেন্ট হবে। এমপ্লয়মেন্টের [কর্মসংস্থান] ব্যবস্থা হবে। চাকরির জন্য কারোর কাছে যেতে হবে না।' গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'দিয়েছি। তবে ওইটা নিয়ে ডিটেইল আইডিয়া নেই। আশা করি সরকার ভালোর জন্য করেছে। সেজন্য দিয়েছি।'
মোহাম্মদপুরের ওই একই কেন্দ্রে মা নুরুননাহার বেগমের সাথে ভোট দিতে এসেছিলেন তরুণী সুজানা হোসেন। তিনিও প্রথমবার ভোট দিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি স্মরণ করে সুজানা বলেন, 'আমরা কিন্তু জুলাইয়ে গেছিলাম বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। আম্মুও গেছিলো। আমরা স্লোগান দিছি, অনেক কিছু করছি। পুলিশ আমাদের সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করছে। আমরা ওইটা আর চাই না। এখন যারা সরকার তারা সেটা করে নাই। জুলাই আন্দোলনের পরেও অনেক কিছু ঠিক হয় নাই। নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সরকার সেটা করবে এটা চাই।'
সুজানার মা নুরুননাহার বেগম জানান, 'ও (সুজানা) কিন্তু ২৪ এর ভোটেও ভোটার ছিলো। আসে নাই। এবার কিন্তু ভোট দিতে আসছে।'
একই সুরে কথা বলেন জিনাত আনিফিন ও জেনিফা তাসনিম নামের দুই বোন। জিনাত বলেন, 'গণঅভ্যুত্থানের যে বার্তা, তা যেন কাজে প্রতিফলিত হয়। মানুষ যেন না ভাবে পরিবর্তন বৃথা গেছে।'
জীবনে প্রথমবার ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিসা হক সুভা। সকাল পৌনে ১০টার দিকে সিদ্ধেশ্বরী বয়েস কলেজে ভোট দিয়ে তিনি বলেন, 'জীবনের প্রথম ভোট খুব এক্সাইটেড ছিলাম। প্রথমে একটু ভয় করছিলো কিন্তু ভোট দিতে গিয়ে আয়োজন শান্তিপূর্ণ দেখে ভয় কেটে গেছে। তবে নারী ভোটার একটু কম মনে হয়েছে। গণভোটও দিয়েছি, আমি চাই যোগ্য নেতৃত্ব আসুক।'
ঢাকা-৭ আসনের লালবাগ মডেল স্কুলে ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটার আসাদ বলেন, 'আমি আগে ভোটার হয়েছি কিন্তু এখন পর্যন্ত ভোট দিতে পারিনি। এবার ভোট দিতে পেরে আনন্দ অনুভব করছি। আশা করি নির্বাচিত সরকার সুন্দর ভাবে দেশ সংস্কার করবেন এবং আমাদের সুন্দর পরিবেশ উপহার দিবেন।'
অন্যদিকে, ঢাকা-১৮ আসনের গুলশান ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে দুই বান্ধবী নূরজাহান আক্তার মিতু ও নূরুন্নাহার আক্তার মীম ভোট দিতে আসেন। মিতু বলেন, 'প্রথমবার ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। দেশের নতুন সংস্কার চাই।' মীম বলেন, 'দেশের নানা সমস্যা আছে। এগুলো সমাধান করা উচিত। এই আশায় গণভোটে অংশ নিয়েছি। সরকারে যারাই আসবে, তারা তরুণদের ইচ্ছাগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করবে, এই প্রত্যাশা দুজনের।'
ঢাকা-১৪ আসনের কল্যাণপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে জহুর নামের এক তরুণ বলেন, 'জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—আপনারা ভালো কাজ করবেন, মানুষের আস্থা ধরে রাখবেন।'
আবার ২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ সামির প্রথম ভোট দিয়ে বলেন, 'তরুণদের কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার বিষয়টি জনপ্রতিনিধিরা গুরুত্ব দিয়ে সংসদে তুলবেন—এটাই প্রত্যাশা।'
সুষ্ঠু পরিবেশ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোট দিতে পেরে তরুণদের চোখে-মুখে ছিল প্রাপ্তির আনন্দ। দেশের নতুন সংস্কার ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে তারা একটি জবাবদিহিমূলক সরকার কামনা করছেন।
