গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী জেন-জি, তবে নির্বাচনে আধিপত্য পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির হাতেই
২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে জেনারেশন জেড বা জেন-জির নেতৃত্বে হওয়া এক গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘসময়ের এক স্বৈরশাসকের। তারপরেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম নির্বাচনে ভোট দিতে চলেছেন বাংলাদেশিরা। লাখ লাখ তরুণ স্বপ্ন দেখেছিল, এই গণ–অভ্যুত্থান দেশের জন্য নতুন এক পথরেখা তৈরি করে দেবে।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যান, আর বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়েন—সেই দৃশ্য পুরো বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই বিদ্রোহ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত অন্যান্য তরুণদের-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনগুলোকে, যার প্রভাব পড়ে নেপাল ও মাদাগাস্কারে এবং সেসব দেশের সরকার পতনে সাহায্য করেছিল।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান হওয়ায় অনেকেই খুশি। তার শাসনামল জাল, পাতানো নির্বাচনের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট এবং ভিন্নমত কঠোরভাবে দমনের মতো বহু ঘটনা ঘটেছিল।
"এই বিপ্লব দেখিয়েছে, জেন-জি কী করতে পারে," সিএনএনকে বলেন মির্জা শাকিল। শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে হওয়া আন্দোলনে তিনি একজন ছাত্র হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
তবে বাস্তবতা হলো, তবে হাসিনা–পরবর্তী যুগে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার দৌড়ে যে দুজন প্রার্থী সবচেয়ে এগিয়ে আছেন, তাঁরা জীবন বাজি রেখে রাজপথে আন্দোলন করা সেই তরুণদের চেয়ে একদমই আলাদা।
এই দুজনের একজনের বয়স ৬০ বছর, যিনি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁর পরিবার কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। অন্যজন ৬৭ বছর বয়সী এক ইসলামপন্থী নেতা, যাঁর দল এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।
শেখ হাসিনার শাসন অবসানের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরেক প্রতিবাদকারী সাদমান মুজতবা রাফিদ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, "আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম যেখানে লিঙ্গ, জাতি, ধর্মনির্বিশেষে সব মানুষের সমান সুযোগ থাকবে। আমরা নীতিগত পরিবর্তন ও সংস্কার আশা করেছিলাম। কিন্তু বর্তমানে যা দেখছি, তা আমাদের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে।"
গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচন
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমেই শেখ হাসিনার পতনের শুরু হয়। এর জবাবে হাসিনার সরকার কঠোর ও রক্তক্ষয়ী দমননীতি গ্রহণ করে। তবে সেই দমন-পীড়ন আন্দোলন দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে।
অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সেনাবাহিনী যখন জানায়, তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাবে না, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়—শেখ হাসিনার শাসনের অবসান অনিবার্য।
২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীরা তাঁর সরকারি বাসভবনে ঢুকে ঢুকে পড়েন, দেয়াল ভেঙে ফেলেন এবং ভেতরের জিনিসপত্র লুটপাট করেন।এই আন্দোলনে তিনি প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
গত নভেম্বরে ঢাকার একটি আদালত সেই অস্থিরতার সময় সংঘটিত অপরাধের জন্য হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের মতে, সেই সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
বর্তমানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান এক উত্তেজনাকর কূটনৈতিক টানাপোড়েনের উৎসে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করতে প্রত্যর্পণের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা বরাবরের মতোই দাবি করে আসছেন, এসব অভিযোগে তিনি নির্দোষ। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা ও তার দলের অনুপস্থিতিতে তাদের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান—সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মরহুমা খালেদা জিয়ার ছেলে—১৭ বছর পর নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন। বর্তমানে তিনি ও তাঁর দল নির্বাচনে জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আরেকটি প্রত্যাবর্তন ঘটছে জামায়াতে ইসলামীর। শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘদিন দমন-পীড়নের মুখে থাকা এই ইসলামপন্থী দলটি আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল 'জাতীয় নাগরিক পার্টি' (এনসিপি) বাংলাদেশের এই জটিল ও সহিংস রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নিজেদের জায়গা করে নিতে বেশ সংগ্রাম করছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে দলটি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের ঘোষণা দেয়, তখন তা অনেকেই বিস্মিত করে।
লন্ডনের সোয়াস (এসওএএস) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক নাওমি হোসেন বলেন, এই জোট মূলত নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়েছে। তিনি সিএনএনকে বলেন, "এনসিপির কেউ কেউ যদি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেন, তবে তাদের আসন পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা থাকে।"
সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনে প্রার্থী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংস হামলার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে—এমন সমালোচনার মুখেও পড়েছে।
এই অস্থিরতা সেই প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত, যা আন্দোলনের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থী লালন করেছিলেন।
বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী নাজিফা জান্নাত বলেন, এনসিপি সংস্কার, অন্তর্ভুক্তি এবং আরও অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যে দল , যে একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি, সেই দলের সঙ্গে জোট করা বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হচ্ছে।
নাজিফার মতে, "এটি একটি লজ্জাজনক ঘটনা। আমরা তাদের জানিয়েছি, বিষয়টি আমাদের জন্য কতটা অপমানজনক।"
তবু আগামী বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন বহু মানুষ এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে দেখছেন। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় এখন তারই অপেক্ষা ও উত্তেজনার আবহ বিরাজ করছে।
হাসিনাবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শাকিল সিএনএনকে বলেন, "এই নির্বাচন নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারে। (নির্বাচন নিয়ে) আমরা উত্তেজিত।"
