বিশ্বের প্রথম ‘জেন-জি’ প্রভাবিত নির্বাচনে ভোট দেবেন বাংলাদেশের ভোটাররা: রয়টার্স
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচনের সময় রাজপথে বিরোধী দলের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। হয় তারা ভোট বর্জন করত, নয়তো জ্যেষ্ঠ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের ফলে কোণঠাসা হয়ে থাকত। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।
নির্বাচনে হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে তার সরকারকে হটাতে সাহায্যকারী অনেক তরুণ বলছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশটিতে ২০০৯ সালে হাসিনার ১৫ বছরের শাসন শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনিসিপি) জামায়াতের জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
বিএনপি প্রধান তারেক রহমান সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তার দল এবং 'সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত' আসন জয়ের বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি সুস্পষ্ট ফলাফল অত্যন্ত জরুরি। হাসিনার পতনের পর টানা কয়েক মাসের অস্থিরতায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশটির তৈরি পোশাক খাতসহ প্রধান শিল্পগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপরও প্রভাব ফেলবে।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, 'জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে, তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ফলাফল নির্ধারণে বেশ কিছু বিষয় কাজ করবে। এর মধ্যে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম—যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—তারা কীভাবে ভোট দেয় তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের পছন্দের গুরুত্ব অনেক।'
বাংলাদেশজুড়ে বিএনপির 'ধানের শীষ' এবং জামায়াতের 'দাঁড়িপাল্লা' প্রতীকের সাদাকালো পোস্টার ও ব্যানার খুঁটি ও গাছে ঝুলছে এবং রাস্তার ধারের দেয়ালে সাঁটানো হয়েছে। এর পাশাপাশি বেশ কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোস্টারও দেখা যাচ্ছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় প্রতীক মোড়ানো নির্বাচনি ক্যাম্পগুলো থেকে প্রচারণার গান বাজছে।
অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তখন কেবল আওয়ামী লীগের 'নৌকা' প্রতীকেরই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত—যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—জয়ী না হলেও এবার তাদের সেরা নির্বাচনি ফলাফল পেতে পারে।
ভারতের প্রভাব কমছে, বাড়ছে চীনের প্রভাব
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের ফলাফল আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ভূমিকাকেও প্রভাবিত করবে। হাসিনাকে ভারতপন্থী হিসেবে দেখা হতো এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করছেন। এর ফলে বাংলাদেশে বেইজিংয়ের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।
নয়াদিল্লির প্রভাব যখন কমছে, তখন কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন জামায়াতের তুলনায় বিএনপি ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সঙ্গতিপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে। পাকিস্তানও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। এছাড়া জামায়াতের জেন-জি মিত্ররা বলেছে, বাংলাদেশে 'নয়াদিল্লির আধিপত্য' তাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় এবং সম্প্রতি তাদের নেতারা চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।
ইসলামি নীতির আলোকে সমাজ পরিচালনার আহ্বান জানানো জামায়াত বলেছে, দলটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে নেই।
বিএনপির তারেক রহমান বলেছেন, তার দল সরকার গঠন করলে এমন যেকোনো দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে, যারা 'আমার জনগণ এবং দেশের জন্য উপযুক্ত প্রস্তাব দেবে'।
বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং দারিদ্র্যের উচ্চ হার থাকা দেশ বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগের ধীরগতির কবলে পড়েছে। এর ফলে ২০২২ সাল থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলারসহ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের সন্ধান করতে বাধ্য হয়েছে।
ঢাকা-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন' এবং 'বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ'-এর জরিপ অনুযায়ী, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো দুর্নীতি। এরপরই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের ইসলামি মতাদর্শের চেয়ে তাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তাদের পক্ষে বেশি কাজ করছে।
জরিপে বলা হয়েছে, 'ভোটারদের ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রবল। তারা ধর্মীয় বা প্রতীকী ইস্যুর চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং এমন নেতাদের প্রত্যাশা করছেন যারা যত্ন, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রদর্শন করবেন।'
তবুও, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং বিএনপি নেতা তারেক রহমানকেই পরবর্তী সরকার প্রধান হিসেবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী বা 'ফ্রন্টরানার' হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলে দলটির আমির শফিকুর রহমানও শীর্ষ পদের দাবিদার হতে পারেন।
প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকার মানুষকে তাদের মতামত প্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেবে।
তিনি বলেন, '(হাসিনার) আওয়ামী লীগকে নিয়ে সবাই ক্লান্ত ছিল। জাতীয় নির্বাচনের সময় মানুষ ভোট দিতে পারত না। মানুষের কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না।' তিনি আরও বলেন, 'আমি আশা করি পরবর্তী সরকার, যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।'
