ইরান যুদ্ধের জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে
গত বছর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে সেই উষ্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্কে হঠাৎই টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।
সংঘাতের জেরে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন সরাসরি বিপদের মুখে। গত বৃহস্পতিবার দুবাইয়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খালাফ আল-হাবতুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ট্রাম্পকে সরাসরি প্রশ্ন করে লিখেছেন, 'আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধে টেনে আনার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?'
তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন এক বিপদের কেন্দ্রে ঠেলে দিয়েছেন, যা তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।
ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ নিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর বন্দর ও বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে, তখন জ্বালানি সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে চলমান অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্পের 'ট্রাম্পকার্ড' ছিল এই বিনিয়োগ
যুদ্ধ শুরুর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ের যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে এই তিন দেশের সম্পর্ক ছিল অনেক ঘনিষ্ঠ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) থেকে শুরু করে গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা—ট্রাম্পের নানা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে এই তিন দেশ ছিল অর্থায়নের প্রধান উৎস।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি'-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো র্যাচেল জিম্বা বলেন, 'এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ করার সক্ষমতা ও আগ্রহ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।'
তিনি আরও বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে। একদিকে তেল ও গ্যাস থেকে আয় কমবে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়বে। ফলে বিদেশে বিনিয়োগ করার মতো বাড়তি অর্থ তাদের হাতে কম থাকবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর দ্বিধা
দুবাইয়ের ধনকুবের ব্যবসায়ী খালাফ আল-হাবতুরের এই প্রকাশ্য সমালোচনা আমিরাতের অভিজাত মহলে বিরল এক ঘটনা। সাধারণত তারা বেশ সতর্কভাবেই জনসমক্ষে কথা বলেন। যদিও আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারের সরকার সরাসরি ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে একে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন ও বেসামরিক জীবনের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার আগে এই দেশগুলো সংঘাতের আশঙ্কা থেকে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিল। তাদের ভয় ছিল, এতে পুরো অঞ্চল যুদ্ধের কবলে পড়বে।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্রের দাবি, ইরানের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ কেবল যুক্তরাষ্ট্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং উপসাগরীয় মিত্রদেরও বিপদে ফেলছে। তার মতে, মার্কিন অভিযান অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নেওয়া হয়েছে।
ব্ল্যাকস্টোন এবং সিসকো সিস্টেমসের মতো বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলে ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও সেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও প্রাইভেট ইকুইটি ভেঞ্চারের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছিলেন। কাতার, জেদ্দা, রিয়াদ ও দুবাইয়ে ট্রাম্পের ব্র্যান্ডেড বিলাসবহুল আবাসিক টাওয়ার এবং গলফ কোর্স তৈরির পরিকল্পনাও ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম সম্পদ তহবিল বড় বড় কোম্পানি অধিগ্রহণেও বড় ভূমিকা রাখছিল। যেমন—সৌদি অর্থায়নে ৫৫ বিলিয়ন ডলারে ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'ইলেকট্রনিক আর্টস' কেনার চেষ্টা, কিংবা আবু ধাবির একটি তহবিলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন কোম্পানি 'ক্লিয়ার চ্যানেল আউটডোর হোল্ডিংস' অধিগ্রহণের উদ্যোগ। এ ছাড়া গত বছরের শেষ দিকে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি অধিগ্রহণের চেষ্টাতেও এই তিন দেশের তহবিলগুলো সমর্থন দিয়েছিল।
এই সংঘাতের ফলে অর্থের প্রবাহ কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর। তবে অর্থনীতিবিদরা ইতিমধ্যেই এ অঞ্চলের জন্য তাঁদের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে আনতে শুরু করেছেন।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকস গত বৃহস্পতিবার তাদের গ্রাহকদের পাঠানো এক নোটে জানিয়েছে, যদি সংঘাত কয়েক সপ্তাহও স্থায়ী হয়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস তারা ১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেবে। সংস্থাটি আরও বলেছে, পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে পারে।
