সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন সামরিক যোগাযোগ স্থাপনায় ইরানের হামলা
শনিবার থেকে ইরানের চালানো হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির যোগাযোগ ও রাডার ব্যবস্থার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর স্যাটেলাইট ছবি ও যাচাইকৃত ভিডিও বিশ্লেষণ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রাপ্ত ছবিতে দেখা যায়, ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তে ব্যবহৃত রাডার ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট ডিশ এবং 'রাডোম' (সংবেদনশীল যোগাযোগ যন্ত্র রক্ষাকারী বিশেষ আচ্ছাদন) কিংবা এর আশপাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সরঞ্জাম মূলত দীর্ঘ দূরত্বে সামরিক যোগাযোগ বজায় রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন সামরিক যোগাযোগ স্থাপনা অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় ঠিক কোন কোন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে হামলার স্থানগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইরান মূলত মার্কিন সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ও সমন্বয় সক্ষমতা ব্যাহত করতেই এসব স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।
এর আগে গত জুনেও ইরান কাতারের একটি ঘাঁটিতে একই ধরনের হামলা চালিয়েছিল; চলতি সপ্তাহে সেই ঘাঁটিতেও আবার আঘাত হানা হয়েছে।
বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক স্থাপনাগুলোতেও একই ধরনের সিস্টেমকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
ইউনাইটেড স্টেটস সেন্ট্রাল কমান্ড-এর এক প্রেস কর্মকর্তা এ হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাহরাইন
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, শনিবার বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (ফিফথ ফ্লিট) সদর দপ্তরে ইরানের একটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ-অভিযান পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এই ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরদিন ওই সদর দপ্তরের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে, অন্তত আরও একটি রাডোম (যোগাযোগ যন্ত্রের আচ্ছাদন) ধ্বংস হয়েছে।
বিধ্বস্ত হওয়া এই দুটি স্থাপনা ছিল মূলত এএন/জিএসসি-৫২বি স্যাটকম টার্মিনাল। এগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কাতার
রবিবার বিকেলে কাতারের আল উদাইদ এয়ার বেস-এর স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে, স্যাটেলাইট ডিশ দিয়ে ঘেরা একটি তাবু ধ্বংস হয়েছে এবং বেশ কিছু ডিশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আল উদাইদ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বৃহত্তম ঘাঁটি, যেখানে কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড-এর আঞ্চলিক সদর দপ্তর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এর আগে গত জুনেও ইরান এই ঘাঁটির যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি রাডোমে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিল।
কুয়েত
কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান-এর স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে, রবিবার সকালের মধ্যে সেখানে অন্তত তিনটি রাডোম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
এর ৫০ মাইল উত্তর-পূর্বে কুয়েতের আলি আল সালেম এয়ার বেস-এ স্যাটেলাইট যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশের অন্তত ছয়টি ভবন বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মঙ্গলবার পাওয়া স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, একই এলাকায় পুনরায় হামলা চালানো হয়েছে এবং স্যাটেলাইট সরঞ্জামের পাশের আরও দুটি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি আরব
শনিবার রাতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ঘোষণা করে যে, তারা সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস-এ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পরদিন সকালে স্যাটেলাইটচিত্রে ওই ঘাঁটির একটি ভবন থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। মঙ্গলবারের চিত্রে দেখা গেছে যে, স্থাপনাটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
আক্রান্ত ভবনটি একটি রাডোম-এর কাছে এবং মূল ঘাঁটি থেকে প্রায় ছয় মাইল পূর্বে একটি বেষ্টনী ঘেরা এলাকায় অবস্থিত। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানিরা সুনির্দিষ্টভাবে ঘাঁটির যোগাযোগ বিভাগকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুয়াইস-এর কাছে একটি সামরিক স্থাপনার স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে, বেশ কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সেখানে এএন/টিপিওয়াই-২ নামের একটি রাডার সিস্টেম মোতায়েন ছিল, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে রাডারটি আক্রান্ত একটি ভবনের পাশেই দেখা গেছে, তবে রাডারটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না তা পরিষ্কার নয়।
অন্যদিকে আমিরাতের আল ধাফরা এয়ার বেস-এ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র কিছুটা অস্পষ্ট। রবিবারের চিত্রে দেখা গেছে যে, ফুটবল মাঠের সমান একটি চত্বরে ঠাসাঠাসি করে থাকা বেশ কিছু ভবন ও তাবু মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সোমবার ওই একই এলাকায় আবারও হামলা চালানো হয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এর আগে জানিয়েছিল যে, দুবাই, ইরাক এবং কুয়েতের আরও কিছু মার্কিন সামরিক স্থাপনা সপ্তাহান্তের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি এয়ার বেস-এও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে জর্ডানের ওই স্থাপনাগুলো যোগাযোগ বা রাডার সিস্টেমের কাছাকাছি ছিল না বলে মনে হচ্ছে।
