পাকিস্তান-আফগানিস্তান ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ আসলে কোন পথে যাচ্ছে?
'আমাদের ধৈর্যের সীমা ফুরিয়ে গেছে,' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনটাই লিখেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ। তিনি আরও যোগ করেছেন, 'এখন আমাদের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে।'
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কান্দাহারে বোমা হামলা চালায়। কান্দাহার তালেবানের সুপ্রিম কমান্ডার হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
'অপারেশন রাইটাস ফিউরি'-র অংশ হিসেবে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলো বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও গোলাবারুদের গুদামে হামলা চালায়। একই সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যরা আফগান সীমান্ত চৌকিগুলোতেও আক্রমণ চালিয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, এই অভিযানে ২৭০-এর বেশি তালেবান সদস্য নিহত এবং ৪০০-এর বেশি আহত হয়েছেন।
এই হামলার প্রস্তুতি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। পাকিস্তান বর্তমানে আফগান তালেবানের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। একসময় পাকিস্তান এই গোষ্ঠীকে আশ্রয় ও সাহায্য দিয়েছিল।
কিন্তু এখন অভিযোগ করছে, ২০২১ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা আফগান তালেবান তাদের আদর্শিক সহোদর 'পাকিস্তানি তালেবান' বা টিটিপি-কে আশ্রয় ও সমর্থন দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিটিপি পাকিস্তানে ব্যাপক সহিংসতা ও হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান দাবি করে, আফগান সরকার তাদের এই সহযোদ্ধাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে, কিন্তু বাস্তবে আফগান তালেবান বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।
এর আগে, গত বছরের অক্টোবর মাসে দুপক্ষের লড়াইয়ের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু গত ২১ ফেব্রুয়ারি সেই চুক্তি ভেঙে যায়, যখন দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ায় টিটিপি-র এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত হন।
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাক্তিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালায় এবং দাবি করে সেখানে ৭০ জন টিটিপি সদস্য নিহত হয়েছে।
কিন্তু আফগান সরকার জানিয়েছে, পাকিস্তানি হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং তারা প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। সেই প্রতিশোধের প্রতিফলন দেখা যায় ২৭ ফেব্রুয়ারি। আফগান বাহিনী সীমান্তজুড়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর হামলা চালায় এবং বেশ কিছু সীমান্ত চৌকি দখলসহ ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহতের দাবি করে।
পাকিস্তান মাত্র ১২ জন নিহতের কথা স্বীকার করলেও এর প্রতিক্রিয়ায় 'অপারেশন রাইটাস ফিউরি' শুরু করে।
তালেবানের কোনো কার্যকর বিমানবাহিনী না থাকলেও তারা সীমান্তের ওপারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। সৌদি আরব, রাশিয়া, চীন ও ইরানসহ বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘও দুই পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
গত পাঁচ বছরের মধ্যে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চারবার সংঘাতের মুখে পড়েছে। গত বছরের আন্তঃসীমান্ত লড়াই অল্পতেই থামানো সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু এই সপ্তাহের ব্যাপক সহিংসতা এবং পুরনো অমীমাংসিত অভিযোগগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পাকিস্তান চায় আফগানিস্তানে টিটিপি-র আস্তানাগুলো নির্মূল হোক, অন্যদিকে আফগান সরকার তাদের ভূখণ্ডে বোমা হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এসব কারণে এবার বাইরের দেশগুলোর হস্তক্ষেপ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ আব্দুল বাসিত বলেন, 'দুই দেশের সম্পর্ক আগে কখনো এতটা খারাপ হয়নি। এটি এখন প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।'
পাকিস্তানে উগ্রবাদী হামলার মাত্রা এখন গত এক দশকের মধ্যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে এই সহিংসতা প্রতি বছরই বাড়ছে।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় ৩২ জন নিহত হন এবং ১৭০ জনেরও বেশি আহত হন। পাকিস্তান জানিয়েছে, এই হামলার পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ আফগানিস্তানের মাটিতে হয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করেছে 'ইসলামিক স্টেট পাকিস্তান প্রভিন্স'।
অন্যদিকে, অক্টোবর থেকে দুই দেশের সীমান্ত বন্ধ থাকায় বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।
এখন সীমান্ত দিয়ে মূলত আফগান শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোকেই যাতায়াত হিসেবে ধরা হচ্ছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ২০ লাখের বেশি মানুষকে বিতাড়িত করা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারিতেই ৭৭ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এখনও পাকিস্তানে প্রায় ২০ লাখ আফগান নাগরিক রয়েছেন।
উভয় দেশই বর্তমানে চরম আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। আফগান সেনাপ্রধান বলেছেন, ভবিষ্যতে বিমান হামলা হলে আরও শক্তিশালী ও চূড়ান্ত জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ দাবি করেছেন, পাকিস্তান যেকোনো আক্রমণকারীকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফের যুদ্ধের হুমকি মূলত আফগানিস্তানে সরকারের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামরিক দিক থেকে পাকিস্তান শক্তিশালী হলেও তালেবানদের ক্ষমতাচ্যুত করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর পরিণতি অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞ আব্দুল বাসিত সতর্ক করে বলেছেন, এটি এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, কারণ তখন টিটিপি ও আফগান তালেবান একজোট হয়ে লড়াই শুরু করবে।
