চীনা বিমান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ায় মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সাবেক পাইলট গ্রেপ্তার
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা এবং 'এলিট ফাইটার পাইলট'কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বেআইনিভাবে চীনের সামরিক পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, বিমানবাহিনীর সাবেক মেজর জেরাল্ড ব্রাউন—যিনি পাইলটদের মধ্যে তার কল সাইন 'রানার' নামে পরিচিত ছিলেন—তাকে বুধবার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্য থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনুমতি ছাড়া চীনা পাইলটদের প্রতিরক্ষা–সংক্রান্ত সেবা প্রদান এবং এ কাজে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
৬৫ বছর বয়সী ব্রাউন বিমানবাহিনীতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাবেক এফ-৩৫ লাইটনিং ২ প্রশিক্ষক পাইলট ছিলেন। এফবিআইয়ের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ও গুপ্তচরবৃত্তি বিভাগের সহকারী পরিচালক রোমান রোজহাভস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, 'ব্রাউন নিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি যাদের সুরক্ষা দেওয়ার শপথ নিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করার জন্য চীনা পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।'
রোজহাভস্কি আরও বলেন, 'চীনা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই গ্রেপ্তার অন্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।'
ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার মার্কিন অ্যাটর্নি জেনিন ফেরিস পিরো বলেন, ব্রাউন এবং 'আমাদের জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত যে কেউ' তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন।
বিচার বিভাগের তথ্যমতে, ব্রাউন ২৪ বছর যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তিনি যুদ্ধ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং 'সংবেদনশীল ইউনিট' কমান্ড করেছেন, যার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বহন ও সরবরাহ–সংক্রান্ত ইউনিটও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তার দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কারণে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ছাড়ার পর ব্রাউন প্রথমে একজন বাণিজ্যিক কার্গো পাইলট হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি একটি প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাইলটদের এফ-৩৫ এবং এ-১০ যুদ্ধবিমান চালানোর প্রশিক্ষণ দিতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ব্রাউন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চীনে যান চীনা সামরিক পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু করতে। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার আগ পর্যন্ত চীনেই অবস্থান করেন।
মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুসারে, চীনা পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ব্রাউনের এই চুক্তির মধ্যস্থতা করেছিলেন স্টিফেন সু বিন নামের এক চীনা নাগরিক। এই সু বিন ২০১৬ সালে চীনের জন্য সামরিক গোপন তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানে হ্যাকিংয়ের ষড়যন্ত্র করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
বিচার বিভাগ আরও জানায়, ব্রাউন বর্তমানে সাবেক ইউএস মেরিন কর্পস পাইলট ড্যানিয়েল ডাগানের মতো একই ধরণের অভিযোগের সম্মুখীন। ডাগানকে ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ডাগানের বিরুদ্ধে চীনা সশস্ত্র বাহিনীকে পাইলট প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ডাগান ২০২৫ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার একটি আদালতে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে আপিল করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মার্ক ড্রেফাস তার প্রত্যর্পণ অনুমোদন করেছিলেন।
৫৭ বছর বয়সী ডাগান একজন স্বীকৃত অস্ট্রেলীয় নাগরিক। তিনি ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ২০১৪ সাল থেকে চীনে বসবাস করছিলেন এবং সেখান থেকে ফেরার কিছুদিন পরই তাকে আটক করা হয়।
রয়টার্স সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডাগানের আইনজীবী ক্রিস্টোফার পারকিন আদালতে বলেন, তার মক্কেলকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা অস্ট্রেলিয়ার জন্য 'অজানা ক্ষেত্র' বা নজিরবিহীন পরিস্থিতি।
তিনি দাবি করেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সময় কিংবা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যর্পণের অনুরোধ করার সময় ওই কাজটি অস্ট্রেলিয়ার আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য ছিল না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র–অস্ট্রেলিয়া প্রত্যর্পণ চুক্তিতে বর্ণিত 'দ্বৈত অপরাধযোগ্যতা' শর্ত পূরণ হয়নি।
২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যৌথভাবে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, চীন তাদের সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের পাশাপাশি ন্যাটো সামরিক বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের নিয়োগের চেষ্টা করছে।
সতর্কবার্তায় বলা হয়, পশ্চিমা সামরিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চীন এই উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিবৃতিতে চীনের সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, পশ্চিমা সামরিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছ থেকে পিএলএ যে ধরনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, তা কেবল টার্গেট করা ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্যই নয়, তাদের সহকর্মী সেনা সদস্যদের এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীকে অনুমোদনহীন প্রশিক্ষণ বা প্রতিরক্ষা–সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ সেবা প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়ানি ও ফৌজদারি—উভয় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে।
