বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ, তবু যুদ্ধের আশঙ্কায় তেল বিক্রিতে ‘অস্বচ্ছ ট্রাস্টিদের’ ওপরই ভরসা ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে ইরান তেল বিক্রি এবং জরুরি পণ্য আমদানির জন্য আরও বেশি 'আনঅফিশিয়াল' বা অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেল তৈরি করছে। তবে বিচারক ও বিশেষজ্ঞরা এতে দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
তেল খাতের নির্বাহী, আইনপ্রণেতা ও বিচারিক কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্র-সম্পর্কিত নামহীন 'ট্রাস্টিদের' একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ইরানের পেট্রোলিয়াম ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্য রপ্তানিতে গোপন চুক্তি চালাচ্ছে। এসব চুক্তি থেকে প্রাপ্ত বিলিয়ন ডলারের আয়ের বড় অংশ এখনও দেশে ফেরেনি।
চলতি মাসে এক বৈঠকে বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মোহসেনি-এজেই বলেন, আর্থিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওই ট্রাস্টিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে এবং তাদের অর্থ ফেরত দিতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'কে তাদের এই তেল ও সুবিধা দিয়েছিল? কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থনীতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা কি বলেননি যে ট্রাস্টিদের অডিট করা হয়েছে?'
বিলিয়ন ডলারের হদিস নেই
বহু বছর ধরে ইরান তেল বিক্রি থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর প্রভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ার মধ্যেই দেশটির অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে এক সাক্ষাৎকারে সাবেক জ্যেষ্ঠ তেল নির্বাহী বলেন, তেল বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, 'সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির আমলে—যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে 'সর্বোচ্চ চাপ' নীতি চালু করেছিলেন—মন্ত্রণালয় সরাসরি তেল বিক্রির অর্থ দেখভাল করত। তবে ইব্রাহিম রাইসির আমলে মন্ত্রণালয়কে একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।'
নিকোর সাবেক সিইও আলী আকবর পুর ইব্রাহিম বলেন, 'পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়কে নিজস্ব ট্রাস্টি বন্ধ করতে বাধ্য করা হয় এবং ব্যাংক ট্রাস্টি তৈরি করা হয়, যারা বাণিজ্যিক ব্যাংকের অধীনে কাজ করত; আর সেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ছিল।'
তিনি অভিযোগ করেন, 'ট্রাস্টিরা নিজেদের জন্য টাকা সরিয়ে নেয় এবং প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার এখনও ফেরেনি। তারা পাকিস্তান ও আফগান নাগরিকদের ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাংক হিসাব খোলে এবং 'শেল কোম্পানি'র মাধ্যমে অর্থ পাচার করে।'
পুর ইব্রাহিম আরও বলেন, ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার আগে রাইসি বিষয়টি খতিয়ে দেখছিলেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকেও জানানো হয়েছিল এবং তিনি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তবে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি।
তিনি জানান, 'দেশের তেলের টাকার জোরে অনেকে রাতারাতি আমিরাতে বিলাসী জীবনযাপন শুরু করেছে।'
সংসদের অর্থনৈতিক কমিশনের সদস্য হোসেন সামসামি বলেন, কিছু এজেন্ট ব্যাংক ট্রাস্টিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তেল বিক্রির অর্থ পাওয়ার ভুয়া ঘোষণা দিয়েছে, যদিও বাস্তবে কোনো অর্থ জমা পড়েনি।
শনিবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সাবেক কর্মকর্তা মাহমুদ খাঘানির উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, স্বাধীন অডিট হলে আত্মসাতের অঙ্ক ১১ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি হতে পারে।
খাঘানি বলেন, 'আন্তর্জাতিক চাপ ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার সময় একটি ছায়া সরকার গড়ে ওঠে এবং ট্রাস্টি-ভিত্তিক এই ব্যবস্থা চালু হয়। বিশেষজ্ঞদের পাশ কাটিয়ে আইআরজিসি ও অন্যান্য অনির্বাচিত সংস্থাসংশ্লিষ্টদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কার্যত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বহু লোক তেলের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে… মাফিয়ারা শুধু তেলেই নয়, সবখানেই সক্রিয়।'
খাদ্য আমদানিকারকরাই এখন তেল ব্যবসায়ী
তেহরানভিত্তিক এক তেল বিশেষজ্ঞ আল জাজিরাকে বলেন, 'অস্বচ্ছ ট্রাস্টি মডেল দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ায়, কারণ জবাবদিহিতা ছাড়া বিপুল অর্থ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে যায়।'
অর্থনীতিবিদ মুর্তজা আফগাহ শারঘ পত্রিকাকে বলেন, 'আত্মসাৎ করা অর্থ মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে ও জনগণের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারত। কারিগরি জ্ঞানের বাইরের লোকদের হাতে কৌশলগত পণ্য তুলে দেওয়া যৌক্তিক বা কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়।'
এদিকে কৃষিমন্ত্রী গোলামরেজা নূরি গেজেলজেহ ঘোষণা দিয়েছেন, খাদ্যসহ জরুরি পণ্য আমদানিকারকদের আনুষ্ঠানিকভাবে তেল বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হবে। তারা তেলের বিনিময়ে পণ্য আমদানি করতে পারবে। নতুন ট্রাস্টিরা ১.৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বার্টার করতে পারবে।
বিশেষ মুদ্রা প্রাধিকার বাতিলের কয়েক সপ্তাহ পর এই ঘোষণা আসে। এর ফলে আগের সুবিধা হারানো আমদানিকারকরাই তেল ট্রাস্টি হিসেবে নতুন করে লাভবান হতে পারে।
রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মোস্তাজাফান ফাউন্ডেশন অব ইসলামিক রেভল্যুশন নতুন প্রাপকদের তালিকায় থাকতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান জানান, এখনো কোনো চালান পাননি।
জানুয়ারির শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সীমান্ত প্রদেশগুলোর গভর্নরদের কিছু ক্ষমতা অর্পণের কথা বলেন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়া আমদানি, পণ্য বিনিময় ও সহজ শুল্ক সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়।
