ইরানকে ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি 'রোডম্যাপ' (শান্তি পরিকল্পনা) পাঠিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি তেহরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান এর আগেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমস, বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে এই খবরটি প্রকাশ করেছে। তবে বিবিসি এখনো পর্যন্ত ওই প্রস্তাবের কোনো নথি দেখেনি এবং বিষয়টি নিশ্চিত হতে কাজ করছে।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এই পরিকল্পনায় বেশ কিছু কঠোর শর্ত ও দাবি রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান একটি দাবি হলো—কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' স্থায়ীভাবে খুলে দেওয়া এবং একে একটি মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান যদি এই ১৫ দফার পরিকল্পনা মেনে নেয়, তবে বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে সব ধরণের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে '১৫ দফা' কাঠামো পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা মূলত প্রায় এক বছর আগে তার আলোচক দলের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।
তাদের মতে, ২০২৫ সালের মে মাসের শেষ দিকে এই ১৫ দফা পরিকল্পনাকে ভিত্তি করে আলোচনা হয়েছিল। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর সেই আলোচনা ভেঙে যায়।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই পরিকল্পনায় কী আছে এবং আগের প্রস্তাবের তুলনায় কতটা পরিবর্তন আনা হয়েছে—তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা চলছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিকল্পনাটি যদি মূলত আগের প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাবের পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে তা হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, অথবা ট্রাম্প বাস্তবতার চেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে—এমন ধারণা তৈরি করতে চাইছেন।
এদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খোলার আগে পরিস্থিতি শান্ত দেখাতে ট্রাম্প এমন বক্তব্য দিয়েছেন। সোমবার রাতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি থেকে সরে এসে তিনি বলেন, '১৫ দফা সমঝোতা' সম্ভব কি না তা দেখতে পাঁচ দিন সময় দেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত দুই দিনে 'খুব ভালো ও ফলপ্রসূ' আলোচনা হয়েছে, যা অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তবে ইরান এ দাবি অস্বীকার করে বলেছে, আলোচনার পুনরারম্ভ নিয়ে কিছু পরোক্ষ যোগাযোগ ছাড়া আর কোনো গোপন আলোচনা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালে প্রস্তাবিত '১৫ দফা' পরিকল্পনার কিছু অংশ এখন পুরোনো হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। কারণ, ২০২৬ সালে ইতোমধ্যে আরও তিন দফা আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো—বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কূটনীতিকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নতুন কোনো পরিকল্পনা এখনো তৈরি হয়নি। এমনকি নতুন কোনো প্রস্তাব থাকলেও তা এখনো ইরানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়নি বা তাদের সম্মতিও পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে যে '১৫ দফা' পরিকল্পনা দেয়, তাতে এমন অনেক শর্ত ছিল, যা ইরানের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন। এতে বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ফলে যে অর্থ ছাড় হবে, তা ব্যবহারের ওপরও কড়াকড়ি থাকবে। পাশাপাশি শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি–সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল, মানবাধিকারসহ অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার প্রস্তাব ছিল।
এ পরিকল্পনায় আরও বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া অর্থ ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহার করতে পারবে না। ইরানের সব ইউরেনিয়াম মজুত দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া এবং ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ মাত্রায় নামিয়ে আনার প্রস্তাবও ছিল। এক মাসের মধ্যে সব সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা অচল করে দেওয়া এবং সেন্ট্রিফিউজগুলো অকার্যকর করার কথাও উল্লেখ করা হয়।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দেয়, জাতিসংঘের তদারকির আওতায় ইরানের বাইরে একটি জ্বালানি ভান্ডার রেখে নতুন বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে তারা।
এছাড়া ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরবকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কনসোর্টিয়াম গঠনের কথাও বলা হয়, যার বাইরে থেকে একজন ব্যবস্থাপক থাকতে পারে।
নতুন করে আলোচনা হলে, যা সম্ভবত পাকিস্তানের তত্ত্বাবধানে ইসলামাবাদে হতে পারে, সেখানে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আর সামরিক হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা চাইতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলের বিষয়টিও আলোচনায় আসবে। উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের কাছ থেকে কোনো ধরনের 'আগ্রাসন নয় এমন চুক্তি' চাইতে পারে।
সব মিলিয়ে, আগের তুলনায় নতুন চুক্তিতে পৌঁছানো আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, এখন বিষয়গুলো শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আরও বিস্তৃত হয়ে গেছে।
মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আবারও আলোচনার প্রস্তাবের কথা নিশ্চিত করেছেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অংশ নিতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে, যা ইরানের জন্য কিছুটা ইতিবাচক বার্তা হতে পারে, কারণ তাকে যুদ্ধ নিয়ে সংশয়ী হিসেবে দেখা হয়।
এদিকে ইরানে হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জি৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্যারিসে জি৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ বিষয়টি সামনে আসবে।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। শুক্রবার ইরান ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপান জানিয়েছে, তারা এই যুদ্ধকে অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয় মনে করে সমর্থন করে না।
এই দেশগুলো বলছে, তারা উপসাগরীয় মিত্রদের সুরক্ষা, আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে তাদের মতে, যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে যুদ্ধবিরতি হওয়া জরুরি।
