হরমুজ: যেখানে সাম্রাজ্য, বাণিজ্য আর যুদ্ধ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুখোমুখি
রাত। অন্ধকার সমুদ্র। দূরে ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বিশাল এক তেল ট্যাংকার। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অদৃশ্য উত্তেজনা। কোথাও থেকে হঠাৎ একটি ড্রোন উড়ে আসতে পারে, কিংবা দূর থেকে ছোড়া কোনো ক্ষেপণাস্ত্র মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে পুরো দৃশ্য।
এই সরু পানিপথে জাহাজ চলাচলের রাস্তা মাত্র দুই মাইল। এ পথে প্রতিটি যাত্রাই যেন একধরনের ঝুঁকির খেলা। কিন্তু হরমুজ ঘিরে এই উত্তেজনা, এই অনিশ্চয়তা-এগুলো নতুন নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হরমুজ প্রণালি এমনই এক জায়গা, যেখানে পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো মুখোমুখি হয়েছে, কখনো সামনাসামনি, কখনো ছায়ার আড়ালে।
পৃথিবীর মানচিত্রে হরমুজ প্রণালিকে যদি প্রথমবার দেখি, তাহলে খুব একটা আলাদা কিছু মনে না-ও হতে পারে। সরু এক পানিপথ। দু'পাশে উপকূল, মাঝখান দিয়ে জাহাজ যাচ্ছে—দেখতে সাদামাটা, আপাত এই সরলতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক বাস্তবতা।
এই এলাকা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্য, বাণিজ্য আর যুদ্ধের কেন্দ্র হয়ে আছে। আজকের উত্তেজনা, আজকের সংঘাত এসব কিছুই আসলে নতুন নয়; বরং বহু পুরোনো এক প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতার নবতর সংস্করণ।
এই প্রণালি এমন একটি ভৌগোলিক জায়গা, যেখানে জাহাজ চলাচলের পথ এতটাই সরু যে কোথাও কোথাও তা মাত্র দুই মাইল চওড়া। কিন্তু এই সরু পথ দিয়েই বিশ্বের বড় বড় জ্বালানিভাণ্ডার থেকে তেল ও গ্যাস বের হয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।
এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা বিঘ্ন হলে তার প্রভাব শুধু একটি অঞ্চলে না, পুরো পৃথিবীতে পড়ে। মনে হয় দুনিয়ার অর্থনীতির গলা যেন চেপে ধরা হয়েছে। এই পানিপথের উত্তর তীর ঘেঁষে যে দেশের অবস্থান, সেটি হলো ইরান।
এই ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে এমন এক প্রভাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ঝুঁকি মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা বহু আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়েই নয়, হরমুজ ও পারস্য উপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জন্য একধরনের 'রুবিকন' হয়ে থেকেছে। অর্থাৎ এমন এক সীমারেখা, যেখান থেকে একবার সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই আর পিছু হটার সুযোগ থাকে না। আর সেই সিদ্ধান্তই অনেক সময় তাদের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতাকে নির্ধারণ করেছে।
রাজনীতিতে প্রবেশের বহু আগে থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রশ্নে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন; তিনি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ়তা বা 'শিরদাঁড়া শক্ত' করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কিন্তু হরমুজের গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু বর্তমানের দিকে তাকালে চলবে না। যেতে হবে অনেক পেছনে। প্রাচীন পারস্য যুগ থেকেই এই অঞ্চল ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। ভারত থেকে আসা মশলা, রেশম, রত্নরাজির মতো পণ্য এই পথ দিয়ে যেত। পণ্যের গন্তব্য ছিল বাগদাদ, সেখান থেকে ইউরোপ।
এই পথ শুধু বাণিজ্যের জন্য নয়, সংস্কৃতি ও যোগাযোগেরও মাধ্যম ছিল। পনেরো শতকের চীনা নৌ-অভিযাত্রী ঝেং হি এই প্রণালিতে এসেছিলেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় পর্যটক মার্কো পোলো এই অঞ্চলের সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি ও সম্ভাবনার কথা লিখে গেছেন। সেই সময় হরমুজ ছিল পৃথিবীর ধনী অঞ্চলগুলোর অন্যতম। এ পথে বাণিজ্যের প্রবাহ মানেই ছিল সম্পদের প্রবাহ।
এই সম্পদ আর অবস্থানই হরমুজকে বারবার টেনে এনেছে সাম্রাজ্যের প্রতিযোগিতায়। গ্রিক, উসমানীয় বা পর্তুগিজরা—প্রত্যেকেই এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। কারণ এই পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ মানেই ছিল বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ, আর বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ মানেই ছিল ক্ষমতা। এখানে যুদ্ধ হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, আবার দখল বদলেছে। হাতবদল হলেও প্রণালির গুরুত্ব কখনো কমেনি।
উনিশ শতকে এসে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলের দক্ষিণ উপকূলকে 'পাইরেট কোস্ট' বা জলদস্যুদের উপকূল নামে ডাকতে শুরু করে। এমন নামকরণের পেছনে ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা। হরমুজের জলদস্যুরা প্রায়ই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাত। এই হামলাগুলো ছিল বাণিজ্যের ওপর সরাসরি আঘাত, আজকের ভাষায় যা অর্থনৈতিক যুদ্ধেরই এক প্রাচীন রূপ। তখনকার অস্ত্র ছিল ভিন্ন, কিন্তু মতলব ছিল অভিন্ন—বাণিজ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা বা বাধাগ্রস্ত করা।
বিশ শতকের ত্রিশের দশকে সৌদি আরব ও বাহরাইনে তেলের আবিষ্কার এই অঞ্চলের গুরুত্বকে একেবারে নতুন মাত্রা দেয়। হরমুজ তখন থেকেই আর নিছক একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথ নয়; বরং হয়ে ওঠে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর দৃষ্টিও এই অঞ্চলের দিকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়। কারণ তেল শুধু সম্পদ নয়, এটি শিল্প, যুদ্ধ ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এরই জেরে এই সরু পানিপথ দিয়ে তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হয়ে ওঠে একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার।
প্রথমে ব্রিটিশরা তাদের নৌ-সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করতো। সমুদ্রপথে টহল, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য হুমকি ঠেকিয়ে রাখা ছিল তাদের প্রধান কাজ। পরে ব্রিটিশ প্রভাব কমে এলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ইরানের শাহ একই ভূমিকা গ্রহণ করেন। পারস্য উপসাগরকে একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ জ্বালানি করিডর হিসেবে বজায় রাখার দায়িত্ব তার ওপরই ন্যস্ত ছিল।
কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব সেই স্থিতাবস্থাকে ভেঙে দেয়। ইরানে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। এর আগেই একটি মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল 'দ্য স্ট্রেইট অব হরমুজ: এ ভালনারেবল লাইফলাইন', সেখানে সতর্ক করা হয়েছিল যে এই প্রণালিতে তেল পরিবহন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সেখানে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল সমুদ্র মাইন, ছোট কাঠের নৌকা দিয়ে নাশকতা এবং অন্যান্য অপ্রচলিত কৌশল।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, সৃজনশীল ও পরিকল্পিত হামলার জন্য এই প্রণালিতে অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, এমন এক ক্ষেত্র যেখানে তুলনামূলক দুর্বল শক্তিও অসম বা গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ব্যবহার করে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এই আশঙ্কার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় ১৯৮০-এর দশকে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। তখন দুই পক্ষই তেলবাহী জাহাজে হামলা চালাতে শুরু করে, যা 'ট্যাংকার যুদ্ধ' নামে পরিচিত হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নৌবাহিনী মোতায়েন করে, যাতে তেল পরিবহন অব্যাহত রাখা যায়।
এই সময়ের ঘটনাগুলো আজকের পরিস্থিতির সঙ্গে একধরনের ঐতিহাসিক প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছে, যেখানে সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি বাণিজ্যপথকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই বর্তমান উত্তেজনাকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রেক্ষাপটে ইরান মূলত একধরনের শক্তির লড়াইয়ে নামছে, যার লক্ষ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই যুদ্ধের পরিসর সীমিত করতে চাপ দেওয়া। কারণ হরমুজই একমাত্র সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানিভাণ্ডারগুলোর সঙ্গে বৈশ্বিক চাহিদার সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়, আর এই পথের উত্তর তীরজুড়ে অবস্থান করছে ইরান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ২৮ ফেব্রুয়ারিতে বিনা উসকানিতে ইরানের ওপর ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সেই হামলার পর তেহরান দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় নামে। এরপর ইরান তেল ট্যাংকার, কার্গো জাহাজ এবং বন্দরগুলোর দিকে গুলি ও ড্রোন ছুড়তে শুরু করে, যার উদ্দেশ্য সরাসরি ধ্বংস নয়; বরং এমন এক আতঙ্ক তৈরি করা, যাতে জাহাজগুলো এই পথে আসতে নিরুৎসাহিত হয়।
এই কৌশলটি নতুন কিছু নয়; বহু পুরোনো একটি সামরিক ধারণার আধুনিক রূপ। ইতিহাসবিদ বিয়াঙ্কা নোবিলোর ভাষায়, হরমুজ সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি মৌলিক কারণে, এটি এমন একটি সরু সামুদ্রিক দরজা, যার মাধ্যমে সম্পদ, সম্পদশালী অঞ্চল এবং বৃহত্তর বিশ্বের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই একটি কৌশলগত পরীক্ষার জায়গা। ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঘোষণা করেছিলেন, পারস্য উপসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার যেকোনো চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। এর পর থেকে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনোভাবে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ইরানের ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন থেকেছেন।
১৯৮০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান যে নৌ-এসকর্ট ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, তা-ও ছিল এই উদ্বেগের একটি বাস্তব প্রতিফলন।
এমনকি রাজনীতিতে আসার আগেই, ১৯৮৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি খোলাচিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেন, পারস্য উপসাগরের তেল পরিবহনের নিরাপত্তার খরচ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং জাপান ও সৌদি আরবের মতো মিত্রদেশগুলোকেও বহন করা উচিত।
একই সঙ্গে তিনি এই অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সীমিত গুরুত্বের বলে উল্লেখ করলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানের কথা বলেন।
এই পুরো ইতিহাসের ভেতর দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, হরমুজ প্রণালি কোনো সাধারণ পানিপথ নয়; এটি এমন একটি অবস্থান, যেখানে ভূগোল নিজেই রাজনীতিকে প্রভাবিত করে, যেখানে ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে এবং যেখানে ছোট একটি ঘটনারও বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
আর সেই কারণেই আজকের এই উত্তেজনা শুধু বর্তমানের কোনো সংকট নয়; এটি এক দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। যে পথ দিয়ে একসময় মশলা আর রেশম ভেসে যেত, আজ সেই পথ দিয়েই ভেসে যায় তেল, আর তার সঙ্গে ভেসে যায় বিশ্বের অর্থনীতির স্পন্দন।
একসময় জলদস্যুরা যেভাবে জাহাজ থামাত, আজ একই কাজ করছে ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়া। নাম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু খেলা একই রয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ, কিন্তু তার উত্তর ভয়ংকর জটিল—এই সরু পানিপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? আর যদি কখনো এই পথ সত্যিই থেমে যায়, তাহলে শুধু জাহাজ চলাচলই বন্ধ হবে না; থেমে যেতে পারে গোটা দুনিয়ার অর্থনৈতিক ছন্দ।
