পাকিস্তানের অনুরোধে ইরানে হামলা স্থগিত, ইসলামাবাদকে কৃতিত্ব দিলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ইরানে পূর্বপরিকল্পিত মার্কিন হামলা এড়ানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
তেহরানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, পাকিস্তানের অনুরোধে তিনি ইরানকে একটি সুযোগ দিয়েছেন।
ট্রাম্প আগে ঘোষণা করেছিলেন যে, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানকে 'খুব কঠোরভাবে' আঘাত করবে। তবে পরবর্তীতে তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সঙ্গে একটি 'চমৎকার সমঝোতায়' পৌঁছাতে সক্ষম হওয়ায় তিনি সেই হামলা বাতিল করছেন।
পাকিস্তানের জন্য ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে একটি অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এই স্বীকৃতি মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর নেপথ্য কূটনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেও সামনে এনেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমলে বিশ্ব তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য এই উত্তেজনা হ্রাস অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক, কারণ তারা জ্বালানি আমদানির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি কমে আসবে।
কূটনৈতিক পটপরিবর্তন
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের শুরুতে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, 'আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের একটি চমৎকার নিষ্পত্তি করেছি।' এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আজ রাতে ইরানকে 'খুব কঠোরভাবে' আঘাত করবে এবং দেশটির তেল ও গ্যাস শিল্পের 'সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ' নিয়ে নেবে।
ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, একটি প্রস্তাবিত চুক্তির আলোচনার বিষয়বস্তু এবং চূড়ান্ত পয়েন্টগুলো যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ইসরায়েল, সৌদি আরব, তুরস্ক, বাহরাইন, কুয়েত, পাকিস্তান, জর্ডান এবং মিসরসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ 'তাত্ত্বিকভাবে এবং বিস্তারিতভাবে' অনুমোদন করেছে।
পাকিস্তানের ভূমিকা
ট্রাম্প বিশেষভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, তেহরানকে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে রাজি করাতে ইসলামাবাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরব এবং কাতারও পক্ষগুলোকে পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠনমূলক আলোচনায় ফিরে আসার জন্য চেষ্টা চালিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে একটি প্রভাবশালী কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল।
ইরানের অবস্থান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন যে, চুক্তির বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। তবে তিনি আরও যোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে এই প্রক্রিয়ায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করেছে, মার্কিন হামলার ফলে 'কার্যত যুদ্ধবিরতি অর্থহীন হয়ে পড়েছে', যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে তা ত্যাগ করেনি।
হরমুজ প্রণালী অবরোধ ও তেলের বাজারে হুমকি
ট্রাম্প এর আগে খারগ দ্বীপ দখলের হুমকি দিয়েছিলেন, যার মধ্য দিয়ে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। তবে পরে তিনি এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমি জানি না আমেরিকার সেই মানসিক শক্তি আছে কি না।'
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, অবরোধ এড়ানোর চেষ্টা করা একটি বাণিজ্যিক জাহাজে তারা হামলা চালিয়েছে।
এর আগে পৃথক একটি তেলবাহী জাহাজে হামলায় নিহত তিন ভারতীয় নাবিকের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা নিন্দা জানিয়েছিল।
অমীমাংসিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখনও অমীমাংসিত। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, ইসরায়েল এই মার্কিন-ইরান চুক্তির অংশ নয়, যা ওই অঞ্চলে চলমান উত্তেজনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ক্যাপশন: হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। ছবি: হোয়াইট হাউজ
