ট্রাম্পের প্রভাব থেকে ইউরোপের মুক্তি: নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্তে আসা বর্তমান যুদ্ধবিরতি ইউরোপের জন্য এক নতুন মোড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসঘাতকতা এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির পর এই মধ্যপ্রাচ্য সংকট ইউরোপকে ওয়াশিংটনের প্রভাব থেকে মুক্ত বা 'স্বাধীন' হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের মতো অনেক ইউরোপীয় নেতাই ট্রাম্পের নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি মৌন সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের মতো নেতারা প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করেন। শুরুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর ধারণা ছিল, ভেনেজুয়েলায় যেভাবে মাদুরো সরকারকে কোণঠাসা করা হয়েছিল, তেহরানের ক্ষেত্রেও হয়তো তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ইউরোপীয় নেতাদের কাছে ট্রাম্প এখন 'রক্ষাকর্তা' থেকে 'ভয়ংকর' এক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর শুরু করা এই যুদ্ধের প্রতি অনীহা বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইতালি তাদের সিসিলি বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। পোল্যান্ড রাশিয়ার হুমকির কথা উল্লেখ করে মধ্যপ্রাচ্যে 'প্যাট্রিয়ট' বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফ্রান্স তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি এবং হরমোজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনা সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। ফ্রান্সের মতে, হরমোজ প্রণালী কেবল কূটনৈতিক উপায়েই সচল করা সম্ভব। এছাড়া স্পেনও তাদের এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ঘাঁটিগুলো এই যুদ্ধে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
ইউরোপের অনেক সরকার মনে করেছিল এই যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি তাদের কৌশলগত সুবিধা দেবে। কিন্তু বর্তমানে তারা বুঝতে পারছে যে, এই সংঘাত রাশিয়ার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দকৃত অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ায় লাভবান হচ্ছে মস্কো, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিয়েভ। কোভিড-১৯ এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর এটি গত পাঁচ বছরে ইউরোপের তৃতীয় অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় নেতারা এখন কঠিনভাবে উপলব্ধি করছেন যে, আন্তর্জাতিক আইনের অবক্ষয় বিশ্বের পাশাপাশি ইউরোপের জন্যও অশনিসংকেত।
ট্রাম্পের একের পর এক উসকানিমূলক বক্তব্য, ইউরোপীয় নেতাদের অপমান এবং ন্যাটো ত্যাগের হুমকি ইউরোপকে ক্লান্ত করে তুলেছে। এমনকি ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী নেতারাও এখন ট্রাম্পের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি থেকে শুরু করে জার্মানির এএফডি এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি—সবাই ট্রাম্পের এই যুদ্ধ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করছেন। কেবল হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান এখনও ট্রাম্পের পক্ষে রয়েছেন, যা আগামী নির্বাচনে তাঁর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ এখন নিজস্ব কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। হরমোজ প্রণালী সচল রাখতে ইউরোপীয়, এশীয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলো একটি বহুপাক্ষিক উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাজ্য বর্তমানে ৪০টিরও বেশি দেশের একটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যারা ইরানকে সাথে নিয়ে হরমোজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে চায়। এই পরিকল্পনায় ইরানের তেল রপ্তানি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য একটি আঞ্চলিক টোল ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
যদি হরমোজ প্রণালী সফলভাবে পুনরায় উন্মুক্ত হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ও ইসরায়েল-ইরান অনাক্রমণ চুক্তি এবং জব্দকৃত ইরানি অর্থ অবমুক্ত করার পথ প্রশস্ত করতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন উপলব্ধি করছে যে, বহুপাক্ষিকতাবাদ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাদের অঙ্গীকার কেবল আদর্শ নয়, বরং নিজেদের কঠোর স্বার্থ রক্ষার জন্যও অপরিহার্য।
