গাজার ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রথম বৈঠকে ট্রাম্প কী অর্জন করতে পারেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর উদ্যোগে গঠিত "বোর্ড অব পিস" এর প্রথম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করতে যাচ্ছেন। ওয়াশিংটনে এই বৈঠকের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্ভবত প্রমাণ করতে চান যে এই প্যানেলটির সম্ভাবনা নিয়ে থাকা সংশয় অমূলক। কারণ এতে সমর্থন জানানো দেশগুলোর মধ্যেও এমন সন্দেহ রয়েছে। এই সম্মেলন তা দূর করতে পারে—যদিও গাজায় যুদ্ধবিরতির পরেও ইসরায়েল তা লঙ্ঘন করেই চলেছে।
বৃহস্পতিবারের এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি "যুদ্ধবিরতি" পরিকল্পনা অনুমোদনের প্রায় তিন মাস পর। ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যার প্রেক্ষাপটে পাস হওয়া ওই প্রস্তাবে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজার পুনর্গঠনে তদারকির জন্য দুই বছরের মেয়াদে 'বোর্ড অব পিস' গঠন এবং একটি তথাকথিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু নভেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটের পর থেকেই বোর্ডটিকে ঘিরে অস্বস্তি, অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকী যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্রদের অনেকেই এই পরিষদ ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের বিস্তৃত উচ্চকাঙ্খা নিয়ে সন্দিহান, যা অনেকেই জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প-কেন্দ্রিক একটি বিকল্প বৈশ্বিক কাঠামো তৈরির প্রয়াস হিসেবে দেখছেন।
এদিকে বোর্ডের সদস্য হিসেবে নাম লেখানো দেশগুলোর মধ্য থেকেও প্রশ্ন উঠেছে—গাজায় বাস্তব পরিবর্তন আনার সক্ষমতা এর আদৌ আছে কি না। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি এতে যুক্ত হয়েছে, আর ইসরায়েল ফেব্রুয়ারির শুরুতে দেরিতে যোগ দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠক পর্যন্ত বোর্ডে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্ব নেই—যা অনেক পর্যবেক্ষকের মতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে বড় বাধা।
ওয়াশিংটনের আরব সেন্টারের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন কর্মসূচির প্রধান ইউসুফ মুনাইয়্যার প্রশ্ন তোলেন, "এই বৈঠক থেকে ট্রাম্প আসলে কী পেতে চান?"
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "আমার মনে হয়, তিনি বলতে চান যে মানুষ অংশ নিচ্ছে, তাঁর উদ্যোগে বিশ্বাস করছে, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতায় আস্থা রাখছে। কিন্তু মূল রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অঙ্গীকার আপনি দেখবেন বলে আমি মনে করি না।"
'একমাত্র কার্যকর প্ল্যাটফর্ম'
মুনাইয়্যারের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার ফিলিস্তিনিদের জীবনমান উন্নয়নে আগ্রহী পক্ষগুলোর জন্য বোর্ড অব পিস এখনো "একমাত্র কার্যকর প্ল্যাটফর্ম"—তবে এটি একইসঙ্গে "অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জড়িত"।
এতে করে, যে সংকট মোকাবিলায় সম্ভবত দশকের পর দশক সময় লাগবে, সেখানে বোর্ডটির স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
মুনাইয়্যার বলেন, "যেসব আঞ্চলিক শক্তি [গাজার] ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিকভাবে উদ্বিগ্ন এবং গণহত্যা নিয়ে শঙ্কিত, তাদের সামনে কার্যত বিকল্প নেই। তারা আশা করছে, এই বোর্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা প্রভাব ও দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা তারা রাখতে পারবে।"
তিনি মনে করেন, যারা বাস্তবতা বোঝেন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হবে "বাস্তবসম্মতভাবে যা অর্জন সম্ভব, সেটিতে মনোযোগ দেওয়া"—যেমন গাজাবাসীর স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণ, তাদের চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধে ইসরায়েলের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় অন্তত ৭২,০৬৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর ঘোষিত "যুদ্ধবিরতি" কার্যকর হওয়ার পরও ৬০৩ জন নিহত হয়েছেন। ২১ লাখ মানুষের প্রায় পুরো জনসংখ্যাই বাস্তুচ্যুত, আর ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস করেছে ইসরায়েল।
ট্রাম্প অবশ্য বৈঠকের আগে ইতিবাচক সুরে কথা বলেছেন। রোববার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে তিনি বোর্ডের "অসীম সম্ভাবনা"র কথা তুলে ধরে একে "ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা" হিসেবে আখ্যা দেন।
তিনি জানান, "গাজা মানবিক ও পুনর্গঠন প্রচেষ্টার জন্য" ৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হবে এবং সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী ও স্থানীয় পুলিশে হাজারো সদস্য দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এদিকে ট্রাম্পের জামাতা এবং তথাকথিত "গাজা নির্বাহী বোর্ড"-এর সদস্য জ্যারেড কুশনার জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনের "মাস্টার প্ল্যান" নিয়ে আরেকটি বেশি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
গাজার ফিলিস্তিনিদের কোনো অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রণীত ওই পরিকল্পনায় উঁচু আবাসিক টাওয়ার, ডেটা সেন্টার, সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্ট, পার্ক ও ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের মতো স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেটা করতে হলে গাজার বিদ্যমান নগর কাঠামো যেটুকু রয়েছে— সেটাও মুছে ফেলতে হবে। এরপরেই সম্ভব নতুন করে নির্মাণের বাস্তবতা।
যদিও কুশনার তখন বলেননি, এই পুনর্গঠন পরিকল্পনার অর্থায়ন কীভাবে হবে। কিন্তু তিনি উল্লেখ করেন, হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর এটি শুরু হবে—যে দুটি বিষয়ের এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
ইসরায়েলের ওপর চাপ?
যুক্তরাষ্ট্র যখন উচ্চাভিলাষী নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছে, তখন ২৫টি সদস্য দেশ ও পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বৈঠকে ট্রাম্প বাস্তবতার সম্মুখীন হতে পারেন। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রিসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক অ্যানেল শেলিনের মতে, বোর্ডের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হলে ইসরায়েলের ওপর একতরফা চাপ প্রয়োগের বিষয়টি তার পক্ষে এড়ানো কঠিন হবে।
তিনি বলেন, "ট্রাম্প চাইছেন দেশগুলো ৫ বিলিয়ন ডলারের দাবির পক্ষে কাগুজে প্রতিশ্রুতি দিক। কিন্তু বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো স্পষ্ট করেছে—কয়েক বছর পর আবার ধ্বংস হয়ে যাবে এমন পুনর্গঠনে তারা আর অর্থ ঢালতে আগ্রহী নয়।"
শেলিনের মতে, ইসরায়েলের বোর্ডে যোগদান যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে তেল আবিবের আরও প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করেছে। যদিও স্থায়ী শান্তির পথে সদিচ্ছার নিদর্শন হতে পারে কোনো ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে এই বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা।
তিনি জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দি মারওয়ান বারঘুতির নাম প্রস্তাব করেন, যিনি ইসরায়েলের জেলে বন্দি। তাকে মুক্ত করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রভাব খাটানোর সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া বোর্ড অব পিসে যোগদানে আগ্রহ প্রকাশ করা রাষ্ট্রগুলো গাজায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় রয়েছে। শেলিন বলেন, "ইসরায়েল প্রতিদিন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং তাদেরই তৈরি 'ইয়েলো লাইন' নামের সীমাকে অতিক্রম করছে।"
ইন্দোনেশিয়া এক হাজাজ্র সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে, যা ভবিষ্যতে ৮ হাজারে উন্নীত হতে পারে। তবে কার্যকর যুদ্ধবিরতি নিশ্চয়তা ছাড়া জাকার্তার সেনাদের মোতায়েন বিলম্বিতই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
"এখনো গাজা সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র," বলেন শেলিন।
সুযোগ নাকি অনিশ্চয়তা?
ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেম -এর ক্রোক ইনস্টিটিউটের মধ্যস্থতা কর্মসূচির পরিচালক লরি নাথানের মতে, বোর্ডের প্রথম বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে কার্যকর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং তা লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা তৈরি করা।
তিনি বলেন, "গাজায় স্থিতিশীলতা ছাড়া বোর্ড অব পিস অর্থবহ পুনর্গঠন ভূমিকা রাখতে পারবে না।"
পরবর্তী বড় পদক্ষেপ হতে পারে সেনা মোতায়েনের অঙ্গীকার, যদিও হামাস স্বেচ্ছায় নিরস্ত্র না হলে তা অচলাবস্থায় পড়তে পারে।
ট্রাম্প নিজেকে প্রায়ই "শান্তির দূত" হিসেবে তুলে ধরেন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিও জানিয়েছেন। তবে নাথান বলেন, "ট্রাম্পের প্রেরণা বহুমাত্রিক। তিনি কি শান্তি চান? হ্যাঁ। শান্তি মধ্যস্থতাকারী হতে চান? হ্যাঁ। নোবেল চান? তাও হ্যাঁ। কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ড কতটা গভীর, তা সবসময় স্পষ্ট নয়।"
বিস্তৃত উচ্চাকাঙ্খা?
বোর্ড অব পিসের পরিধি গাজার গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এর প্রতিষ্ঠাকালীন সনদে, যেখানে প্রচলিত শান্তি প্রতিষ্ঠা পদ্ধতির সমালোচনা করে আরও "দ্রুত ও কার্যকর" আন্তর্জাতিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে।
সমালোচকরা এই পর্ষদে ট্রাম্পের চেয়ারম্যান পদ ও একক ভেটো ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, যা বহুপাক্ষিকতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রিচার্ড গোয়ান বলেন, "যদি ট্রাম্প ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে সব নিয়ন্ত্রণ করেন, প্রস্তাব আটকে দেন, তাহলে এমনকি যারা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায় তারাও দ্বিধায় পড়বে।"
তবে তিনি যোগ করেন, "যদি ট্রাম্প ভিন্নমত শোনার মনোভাব দেখান—বিশেষ করে আরব দেশগুলোর বক্তব্য গুরুত্ব দেন—তাহলে এটি অন্তত একটি কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামো হয়ে উঠতে পারে।"
বৃহস্পতিবারের বৈঠক তাই বোর্ড অব পিসের ভবিষ্যৎ গতিপথ ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।
