বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ধ্বংসের মূলে তিন ‘ক্ষুধার্ত শিকারি’—ট্রাম্প, পুতিন ও নেতানিয়াহু: অ্যামনেস্টি
ট্রাম্প, পুতিন ও নেতানিয়াহুকে 'ক্ষুধার্ত শিকারি' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি বলছে, এই তিন নেতা কেবল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে মত্ত এবং তাদের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইসরায়েল বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, 'একটি বৈশ্বিক পরিবেশ, যেখানে আদিম হিংস্রতা বিকশিত হতে পারে, তা দীর্ঘদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল।'
তিনি বলেন, ২০২৫ সালে এমন বড় নীতিগত পরিবর্তন দেখা গেছে, যা হলোকাস্ট ও বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। গত ৮০ বছরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সেই ব্যবস্থা এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
লন্ডনে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ক্যালামার্ড বলেন, অধিকাংশ সরকার এসব 'শিকারি'র মোকাবিলা না করে তাদের তুষ্ট করার পথ বেছে নিচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ তাদের আচরণও অনুকরণ করছে।
তবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার সমালোচনায় ইউরোপে ব্যতিক্রম হিসেবে স্পেনের প্রশংসা করেন তিনি। তার মতে, দ্বৈত মানদণ্ডের ঊর্ধ্বে অবস্থান নিয়ে স্পেন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
ক্যালামার্ড যুক্তি দেন যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বের ওপর এক 'ভয়াবহ ক্ষতিকর' প্রভাব ফেলেছেন। তিনি বলেন, তাদের এই আচরণ অন্যদেরও একই পথে চলতে উৎসাহিত করছে এবং এর ফলে আমরা তিন-চার বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও নিষ্ঠুর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি।
অ্যামনেস্টির ৪০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে 'স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড তীব্র হয়েছে'। এছাড়া আফগানিস্তান থেকে জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত বহু দেশের মৌলিক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা, ইউক্রেনে রাশিয়ার 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে এমন সংঘাতের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে আন্তর্জাতিক আইনকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের এক অংশে ফিলিস্তিনপন্থী সংহতি আন্দোলন এবং 'ফিলিস্তিন অ্যাকশন' নামক সংগঠনের ওপর দমন-পীড়নের জন্য যুক্তরাজ্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্য 'ফিলিস্তিন অ্যাকশন'কে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার আইনি লড়াই চালাচ্ছে।
এছাড়া ২০২৫ সালে আফগানিস্তানে নারীদের শিক্ষা ও কাজ থেকে বঞ্চিত করে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বজায় রাখার জন্য তালেবানকে দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে নেপালি কর্তৃপক্ষ দলিত নারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা তদন্তে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অ্যামনেস্টির এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে এল যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক যুদ্ধ চলছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ৩,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, আর লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২,৪০০ জন। গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় নিশ্চিত নিহতের সংখ্যা ৭২,৫০০ ছাড়িয়েছে। এছাড়া চার বছর আগে শুরু হওয়া রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযানে ইউক্রেনে ১৫,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে ক্যালামার্ড বলেন, 'এগুলো আসলে আইনহীনতারই ফল। যেখানে যুদ্ধ এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানবতার মৌলিক মানদণ্ড বারবার লঙ্ঘন করা সত্ত্বেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।'
তবে পুরো চিত্রকে একেবারে হতাশাজনক বলছে না অ্যামনেস্টি। প্রতিবেদনে কিছু 'প্রতিরোধের' উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ; আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলায় বিভিন্ন দেশের সমর্থন; ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিরুদ্ধে আইসিসি-র মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ; ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আগ্রাসনের বিচারের জন্য কাউন্সিল অফ ইউরোপের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং 'লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের' জন্য দুই তালেবান নেতার বিরুদ্ধে আইসিসি-র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
