সর্বোচ্চসংখ্যক নিরপরাধ অভিবাসী তাড়ানোর রেকর্ড; তবু ওবামা-বাইডেনের চেয়ে এখনও পিছিয়ে ট্রাম্প
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার এক বছর পূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ২০ জানুয়ারি এই বর্ষপূর্তিতে তার প্রশাসন বেশ গর্বের সঙ্গেই ঘোষণা করে, দেশ থেকে 'অবৈধ' অভিবাসীদের তাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা 'ঐতিহাসিক রেকর্ড' গড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে গত এক বছরে প্রায় ৩০ লাখ অবৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২২ লাখ মানুষ 'স্বেচ্ছায়' ফিরে গেছেন এবং ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া এই পরিসংখ্যান নিয়ে অবশ্য ধোঁয়াশা কাটছে না। এসব সংখ্যার বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, আবার স্বাধীনভাবে তা যাচাই করারও সুযোগ নেই। ফলে এই দাবি আসলেই 'ঐতিহাসিক' কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের আমলের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি কিছুটা অন্য রকম মনে হতে পারে।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রশাসনের অভিবাসন নীতির মধ্যে বড় একটি পার্থক্য রয়েছে। ওবামা ও বাইডেন মূলত 'অপরাধী' অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার ওপর জোর দিতেন।
অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিংবা যারা সদ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা 'অবৈধ' অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও আগের প্রশাসনগুলোতে সাধারণত যারা দীর্ঘকাল ধরে দেশটিতে বসবাস করছেন বা যাদের পরিবার আছে, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হতো। কিন্তু এসবের কোনো তোয়াক্কা-ই করছে না ট্রাম্প প্রশাসন।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির চোখে, কাগজপত্রহীন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ বিদেশিই 'অপরাধী'। তাদের নির্বিচারে ধরপাকড় করা হচ্ছে। এমনকি যাদের আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন ঝুলে আছে কিংবা বৈধ ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে, তারাও রেহাই পাচ্ছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরগুলোর রাস্তায় এখন দেখা মিলছে মুখোশধারী ইমিগ্রেশন এজেন্টদের। তারা কোনো রাখঢাক না করেই গাড়ির জানলা ভেঙে বা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ধরপাকড় চালাচ্ছে। হাসপাতাল, স্কুল বা উপাসনালয়ের মতো 'স্পর্শকাতর' এলাকাগুলোতে অভিযান না চালানোর যে অলিখিত নীতি আগে ছিল, ট্রাম্প তা বাতিল করেছেন। এমনকি নিয়ম মেনে অভিবাসীরা যখন আদালতে হাজিরা দিতে যাচ্ছেন, সেখান থেকেও তাদের আটক করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের আমলে ফেরত পাঠানো অভিবাসীদের অপরাধের রেকর্ড রয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, ফেরত পাঠানোদের বড় অংশই নিরপরাধ সাধারণ অভিবাসী।
তা ছাড়া, ট্রাম্প বছরে ১০ লাখ মানুষকে বের করে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সংখ্যাটি ৬ লাখ ৭৫ হাজার; সেই লক্ষ্যের চেয়ে বেশ কম। এমনকি বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছরে (২০২৪) আনুমানিক ৬ লাখ ৮৫ হাজার অভিবাসীকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, যা ট্রাম্পের বর্তমান সংখ্যার চেয়ে বেশি।
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট বলছে, সীমান্তে বা বিমানবন্দর থেকে যাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদেরও হয়তো এই ফেরত পাঠানোর তালিকায় যুক্ত করে সংখ্যাটি বড় করে দেখানো হচ্ছে।
আসলে কাকে কীভাবে গণনা করা হচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার মেয়াদের শুরুতে নমনীয়তার জন্য সমালোচিত হলেও শেষ দুই বছরে অভিবাসী তাড়ানোর গতি বাড়িয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ২০ লাখ অভিবাসীকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। এর বাইরে করোনা মহামারির সময় 'টাইটেল ৪২' নীতির আওতায় ৩০ লাখেরও বেশি মানুষকে সীমান্তে আটকে দেওয়া হয়েছিল, যা এই হিসাবের বাইরে।
অভিবাসী তাড়ানোর রেকর্ডে বারাক ওবামার নামও বেশ জোরেশোরেই উচ্চারিত হয়। দুই মেয়াদে ৩০ লাখেরও বেশি অভিবাসীকে ফেরত পাঠিয়ে তিনি 'ডিপোর্টার-ইন-চিফ' (অভিবাসী তাড়ানোয় প্রধান) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। ২০১৩ সালে তার সময়ে রেকর্ড ৪ লাখ ৩৩ হাজার মানুষকে 'ফরমাল ডিপোর্টেশন' বা আদালতের আদেশের মাধ্যমে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত এক বছরে সর্বোচ্চ। তবে ওবামার অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল কারাগারে থাকা অপরাধীরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অভিযানের সঙ্গে ওবামা বা বাইডেন আমলের বড় পার্থক্য হলো আইনি প্রক্রিয়ায়। ট্রাম্পের অধীনে এখন আদালতের আদেশের তোয়াক্কা না করেই 'এক্সপেডিটেড রিমুভাল' বা দ্রুত ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বেশি অনুসরণ করা হচ্ছে। আগে এই নিয়মটি শুধু সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা দেশের ভেতরেও প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলা থেকে কাজ ও আশ্রয়ের খোঁজে এক বছর আগে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন হুয়ান। বাইডেন প্রশাসনের চালু করা 'সিবিপি ওয়ান' অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ম মেনেই আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার প্রথম দিনেই ট্রাম্প এই কর্মসূচি বাতিল করেন। গত ১২ অক্টোবর তাকে ডোমিনিকান রিপাবলিকে ফেরত পাঠানো হয়। এর প্রায় দেড় মাস আগে পেনসিলভানিয়ায় হুয়ানের কর্মস্থলে হঠাৎ চড়াও হয় ইমিগ্রেশন এজেন্টদের একটি দল। সকাল ৬টায় চালানো ওই অভিযানে হুয়ানসহ ৩৩ জন শ্রমিককে আটক করা হয়।
ইউসি বার্কলের আইন বিষয়ের অধ্যাপক ডেভিড হাউস ম্যান জানান, বর্তমানে আইসিই বা অভিবাসন এজেন্টদের রাস্তায় ধরপাকড় আগের তুলনায় ১১ গুণ বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যাদের কোনো ধরনের অপরাধের রেকর্ড নেই, এমন ব্যক্তিদের আটক করার হার বেড়েছে ৭ গুণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অভিবাসীদের ধরপাকড় বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো সীমান্তে অনুপ্রবেশ নজিরবিহীনভাবে কমে যাওয়া। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর (২০২৫) মাসে গড়ে মাত্র ৭ হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অথচ ২০২৪ সালেও এই গড় ছিল ৮৮ হাজার। এমনকি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা আড়াই লাখে পৌঁছেছিল।
সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী কমে যাওয়ায় দেশটির সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বা 'বর্ডার প্যাট্রোল'-এর কাজও অনেকটা কমে গেছে। ফলে এই বাহিনীর সদস্যদের এখন কাজে লাগানো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। তারা অভিবাসন বিভাগ এর সঙ্গে মিলে শহরগুলোতে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করছে।
এ বিষয়ে ইউসি বার্কলের আইন বিষয়ের অধ্যাপক ডেভিড হাউস ম্যান বলেন, '২০২৫ সালে সীমান্তে ফেরত পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে (যা বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছর থেকেই কমতে শুরু করেছিল)। তবে এর বিপরীতে দেশের ভেতর থেকে অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার হার বেড়েছে কয়েক গুণ। অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ফলেই এমনটা ঘটছে। তাই স্রেফ মোট সংখ্যা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা বোঝা সম্ভব নয়।'
