ওবামা দম্পতিকে বানর রূপে দেখিয়ে ভিডিও পোস্ট: সমালোচনার মুখে সরালেন ট্রাম্প; দোষ চাপল কর্মীর ঘাড়ে
নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় বারাক ওবামা ও মিশেল ওবামাকে বর্ণবাদী কায়দায় 'বানর' রূপে দেখানো একটি ভিডিও পোস্ট করে পরে তা সরিয়ে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
'দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট' গানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া এই ক্লিপটি ৬২ সেকেন্ডের একটি ভিডিওর শেষ অংশে ছিল। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে ওই ভিডিও শেয়ার করেছিলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কৃষ্ণাঙ্গ সিনেটর টিম স্কট প্রেসিডেন্টকে পোস্টটি সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি 'বর্তমান হোয়াইট হাউস থেকে আসা সবচেয়ে বর্ণবাদী বিষয়'।
প্রথমে হোয়াইট হাউস ভিডিওটির পক্ষ নিয়ে একে একটি 'ইন্টারনেট মিম' বলে দাবি করে সমালোচকদের 'ভুয়া ক্ষোভ' প্রকাশ বন্ধ করতে বলে।
তবে নিজ দলের কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরসহ চারদিক থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, একজন কর্মী 'ভুলবশত' ভিডিওটি পোস্ট করেছিলেন।
এই ক্লিপে কৃষ্ণাঙ্গদের বানরের সঙ্গে তুলনা করে পুরোনো সেই বর্ণবাদী ক্যারিকেচারের প্রতিফলন দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভিডিওটি 'জেরিয়াস' নামক এক রক্ষণশীল মিম ক্রিয়েটরের অক্টোবর মাসের একটি এক্স পোস্ট থেকে নেওয়া হয়েছে।
ওই ভিডিওতে নিউইয়র্কের রিপ্রেজেন্টেটিভ আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ, নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনসহ আরও কয়েকজন হাই-প্রোফাইল ডেমোক্র্যাট নেতাকে পশু হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এমনকি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের পূর্বসূরি জো বাইডেনকেও ভিডিওতে কলা খেতে থাকা বানর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ওবামা দম্পতি এখন পর্যন্ত এই ভিডিও নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ট্রাম্প তার পোস্টে নিজে কোনো সরাসরি মন্তব্য না করলেও, রাতে তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা ডজনখানেক ভিডিওর মধ্যে এটি তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
ট্রাম্পের নিজের দলের ভেতর থেকেও এ নিয়ে কড়া সমালোচনা ধেয়ে আসে।
সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সেনেটর ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র টিম স্কট সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, 'আমি প্রার্থনা করছিলাম যেন এটি ভুয়া হয়; কারণ এটি বর্তমান হোয়াইট হাউস থেকে আসা সবচেয়ে বর্ণবাদী কাজ।'
নিউইয়র্কের আরেক রিপাবলিকান রিপ্রেজেন্টেটিভ মাইক ললার এই পোস্টকে 'ভুল এবং অত্যন্ত আপত্তিকর' অভিহিত করে বলেন, 'এটি ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলবশত—অবিলম্বে মুছে ফেলে ক্ষমা চাওয়া উচিত।'
পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার পরও সমালোচনা থামেনি।
ইউটাহর রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ভিডিওটি 'স্পষ্টতই বর্ণবাদী এবং ক্ষমার অযোগ্য'।
সিবিএস-এর তথ্যমতে, ফ্লোরিডার প্রতিনিধি ও ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমর্থক বায়রন ডোনাল্ডস ভিডিওটি পোস্ট হওয়ার পর হোয়াইট হাউসে যোগাযোগ করেন। তাকে বলা হয়, এটি একজন কর্মীর কাজ ছিল।
প্রেসিডেন্টের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে কতজনের প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং কোনো পোস্ট করার আগে তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ঠিক কী, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে বিবিসি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
দিনের শুরুতে বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ওই ক্লিপটি মূলত 'একটি ইন্টারনেট মিম থেকে নেওয়া যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বনের রাজা এবং ডেমোক্র্যাটদের লায়ন কিং চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে'।
ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার আগে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অভ কালারড পিপল-এর প্রেসিডেন্ট ডেরিক জনসন বলেন, ট্রাম্প আলোচিত এপস্টিন-কাণ্ড ও দেশের 'দ্রুত ধসে পড়া অর্থনীতি' থেকে জনগণের নজর সরিয়ে নিতেই এমনটা করেছেন।
ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিটজকার একটি সংক্ষিপ্ত পোস্টে বলেন, 'ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন বর্ণবাদী।'
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের কার্যালয় এক্স পোস্টে লিখেছে: 'প্রেসিডেন্টের এমন আচরণ জঘন্য। প্রতিটি রিপাবলিকান সদস্যের উচিত এখনই এর নিন্দা জানানো।'
হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফরিস এই ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পকে 'নীচ, উন্মাদ এবং অনিষ্টকারী' বলে মন্তব্য করেন।
ওবামা দম্পতির ওই ক্লিপটি ছিল এক মিনিট দীর্ঘ একটি ভিডিওর শেষাংশ, যেখানে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্রের দাবি করা হয়েছিল। তবে ডমিনিয়ন ভোটিং সিস্টেমস কর্তৃক কিছু সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে করা আইনি লড়াইয়ে এই দাবিগুলো আগেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
ওবামাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ট্রাম্পের।
প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেও তিনি নিয়মিত মিথ্যা দাবি করে বলতেন, হাওয়াই দ্বীপে জন্ম নেওয়া ওবামার জন্ম আসলে কেনিয়ায়; সে কারণে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন।
যদিও পরে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, ওবামা যুক্তরাষ্ট্রেই জন্মগ্রহণ করেছেন।
