লোহিত সাগরে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ পশ্চিমারা, বড় চ্যালেঞ্জ হরমুজ প্রণালী
জ্বালানি পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে এবং হরমুজ প্রণালীকে উন্মুক্ত রাখতে আলোচনার চেষ্টা করছে পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো। কিন্তু এর আগে লোহিত সাগরে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে একই ধরনের পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কারণে ব্যর্থ হয়।
লোহিত সাগরের সেই অভিজ্ঞতা হরমুজ প্রণালী রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী বর্তমানে বন্ধ করে রেখেছে হুথিদের চেয়েও অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইরান।
ইরানের হুমকি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম ইতিহাসে রেকর্ড বেড়েছে। হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা না হলে সরবরাহ সংকট তীব্র হবে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য বহু পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি করবে।
কুয়েত পেট্রোলিয়ামের সিইও শেখ নওয়াফ সউদ আল-সাবাহ মঙ্গলবার হিউস্টনে অনুষ্ঠিত সেরাউইক এনার্জি কনফারেন্সে বলেছেন, 'হরমুজ প্রণালীর বিকল্প নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও বাস্তবতায় বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল।'
গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা হরমুজ প্রণালী রক্ষায় আলোচনা করছে। কিছু দেশ প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও হরমুজ প্রণালী পুনরুদ্ধারে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।
রয়টার্স ১৯ জন নিরাপত্তা ও সমুদ্র বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে।
তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এই প্রণালী রক্ষা করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। হুথিদের তুলনায় ইরানের সামরিক শক্তি অনেক উন্নত। ইরানের কাছে রয়েছে সস্তা ড্রোন, ভাসমান মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র এবং পাহাড়ি উপকূল থেকে সরাসরি চ্যানেল পর্যন্ত সহজ প্রবেশাধিকার। তাই হরমুজ প্রণারী রক্ষার জন্য বড় যুদ্ধজাহাজ, বিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টারের সমন্বিত অপারেশন প্রয়োজন।
অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি বলেছেন, 'হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা রক্ষা করা লোহিত সাগরের থেকে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।'
১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাংকার এস্কোর্টে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রণালী উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানির মূল্য পুরোপুরি স্থিতিশীল হবে না।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
গত সপ্তাহে একজন ইরানি আইনপ্রণেতা দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, এখন থেকে হরমুজ দিয়ে চলাচলরত জাহাজ থেকে ফি নেওয়ার কথা ভাবছে বলে জানিয়েছে ইরান।
এদিকে, হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় চিন্তার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে ঠিক কতটা সরাসরি জড়াবে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিষ্কার অবস্থান দিচ্ছেন না।
প্রথমে ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু পরে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব অন্য দেশগুলোরই নেওয়া উচিত।
হরমুজের জটিল পরিস্থিতি
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা থেকে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল রক্ষায় অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক মাস পর ইউরোপের দেশগুলোও এই অভিযানে যোগ দেয়।
মিত্র দেশগুলো শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও, হুথিরা ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চারটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। এর ফলে শিপিং কোম্পানিগুলো এখন আর ওই পথ ব্যবহার করতে চায় না।
আগে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ হতো এই পথ দিয়ে। এখন তারা দীর্ঘ পথ ঘুরে হর্ন অব আফ্রিকা দিয়ে চলাচল করে।
নৌ-বিশ্লেষক জোশুয়া ট্যালিস বলেছেন, লোহিত সাগরে অভিযান চালিয়ে তাৎক্ষণিক বা কৌশলগত পর্যায়ে কিছু সাফল্য পাওয়া গেলেও, সামগ্রিকভাবে এটি বড় কোনো জয় নয়—বরং পিঠ বাচানো বা এমনকি কৌশলগত ব্যর্থতাও বলা যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকিপূর্ণ অংশ লোহিত সাগরে বাব এল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে হুথিদের হামলা করা এলাকার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বড়। ফলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কঠিন।
এছাড়া হুথিদের তুলনায় ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অনেক বেশি শক্তিশালী ও পেশাদার বাহিনী। তাদের নিজস্ব অস্ত্র কারখানা রয়েছে এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নও আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে অন্তত এক ডজন বড় যুদ্ধজাহাজ (যেমন ডেস্ট্রয়ার) প্রয়োজন হতে পারে। এর পাশাপাশি বিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টারের সহায়তাও দরকার হবে, কারণ জায়গাটি সংকীর্ণ হওয়ায় সেখানে চলাচল ও প্রতিরক্ষা কঠিন।
সেইসঙ্গে আকাশপথে নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ড্রোন বা বিস্ফোরকবোঝাই ছোট জাহাজও সহজেই হামলা চালাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, ডেস্ট্রয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারলেও, একসঙ্গে মাইন পরিষ্কার করা, বিভিন্ন দিক থেকে আসা ড্রোন-নৌকার হামলা ঠেকানো এবং জিপিএস সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসি যোদ্ধাদের কাছে পাহাড়ি উপকূল বরাবর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভাণ্ডার লুকানো আছে। এই উপকূলের দৈর্ঘ্য শত শত মাইল, ফলে সেগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু জায়গায় উপকূল এত কাছাকাছি যে, মাত্র ৫-১০ মিনিটের মধ্যে জাহাজে ড্রোন হামলা করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক ইউরোপীয় ইনস্টিটিউটের পরিচালক আদেল বাকাওয়ান বলেন, এখানে শুধু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা ভাসমান মাইনই শেষ কথা নয়, এগুলো ধ্বংস করা গেলেও আত্মঘাতী হামলার ঝুঁকিও রয়ে যায়।
অবসরপ্রাপ্ত রয়্যাল নেভির কমান্ডার টম শার্প বলেন, লোহিত সাগরে মাইন এবং ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ছোট সাবমেরিন মোকাবিলা করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তাই হরমুজে ঝুঁকি অনেক বেশি।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অভিযানে একটি ডেস্ট্রয়ারও হারায়, তাহলে পুরো পরিস্থিতির হিসাবই বদলে যাবে। কারণ একটি ডেস্ট্রয়ারে প্রায় ৩০০ নাবিক থাকে, যাদের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
এই মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালীতে মাইন পেতেছে, এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
এর আগেও শোনা যায় ইরান হরমুজে প্রায় এক ডজন মাইন বসিয়েছে।
হাডসন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ক্লার্ক বলেছেন, মাইন অপসারণ, সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং আকাশপথে টহল—এই তিনটির সমন্বয়ে ধীরে ধীরে প্রণালীতে আবার জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের আইআরজিসি-এর হুমকি পুরোপুরি কমাতে এ ধরনের কার্যক্রম কয়েক মাস ধরে চালিয়ে যেতে হতে পারে।
