এপস্টিন-কাণ্ডের জেরে গদি হারানোর মুখে এক বিশ্বনেতা—তবে তিনি ট্রাম্প নন
কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কখনোই কোনো সম্পর্ক ছিল না। অথচ সেই এপস্টিন-কাণ্ডের জেরেই এখন স্টারমারের প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে টানাটানি। অন্যদিকে, তদন্ত ফাইলে নাম থাকার পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে দিব্যি নির্ভার।
আটলান্টিকের দুই পাড়ে এই কেলেঙ্কারির প্রভাব দুই রকম। একদিকে যখন যুক্তরাজ্যে এ নিয়ে রাজনৈতিক ঝড় বইছে, ওয়াশিংটনে বিচারের চাকা যেন ঘুরতেই চাইছে না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্রিটেনে জবাবদিহি ও তদন্তের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করছে বলেই স্টারমার চাপে আছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগ ও রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের ওপর ট্রাম্পের এতটাই প্রভাব যে, তাকে কোনো জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে না।
এপস্টিন মারা যান প্রায় সাত বছর আগে। ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। কিন্তু নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড—বিশ্বজুড়ে তার অপকর্মের ডালপালা এখনো বিস্তৃত।
এপস্টিনের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
ব্রিটেনে এই ক্ষোভ এত তীব্র যে রাজা তৃতীয় চার্লস তার নিজের ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুকেও ছাড় দেননি। এপস্টিনের সঙ্গে বন্ধুত্বের জেরে অ্যান্ড্রুর রাজকীয় খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এমনকি উইন্ডসর ক্যাসলের বাসভবন থেকেও তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য এমন চিত্র বিরল। সেখানে এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা রথী-মহারথীদের তেমন কোনো বড় শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়ে দিয়েছে, এপস্টিন-কাণ্ডে নতুন করে আর কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে না। এই ঘোষণার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন বিষয়টি এখানেই ধামাচাপা পড়ে যাক।
নতুন প্রকাশিত নথিতে ট্রাম্পের নাম থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ মেলেনি। কর্তৃপক্ষও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি। তবে কিছু নথিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যাচাই না করা নতুন কিছু যৌন হেনস্তার অভিযোগ এবং এপস্টিনের শিকার হওয়া নারীদের জবানবন্দিতে তার নাম উঠে এসেছে।
এসবের পরেও এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নির্দ্বিধায় বলেছেন, 'এখন সময় হয়েছে দেশের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার।'
অন্যদিকে, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অবস্থা ঠিক উল্টো। তিনি হয়তো এখন মনে মনে ভাবছেন, ট্রাম্পের মতো তিনিও যদি বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারতেন! নিজ দল লেবার পার্টির এমপিদের বিদ্রোহে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের মসনদ এখন টলমল। একের পর এক সংকটে জর্জরিত স্টার্মারের প্রধানমন্ত্রীত্ব এখন সুতোয় ঝুলছে।
সমস্যার মূলে রয়েছে পিটার ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। গত বুধবার পার্লামেন্টে স্টারমার স্বীকার করেছিলেন, ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টিনের বন্ধুত্বের কথা তিনি জানতেন। জেনেও তাকে রাষ্ট্রদূত করায় বিতর্কের ঝড় ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বৃহস্পতিবার আবারও ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
সাংবাদিকদের স্টারমার বলেছেন, 'ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টিনের পরিচয়ের বিষয়টি গোপন ছিল না। কিন্তু তাদের সম্পর্কের গভীরতা এবং অন্ধকার দিক সম্পর্কে আমাদের কারও কোনো ধারণা ছিল না।'
এর আগে এপস্টিন–সংক্রান্ত কিছু নথি প্রকাশ পেলে জানা যায়, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও বন্ধু এপস্টিনকে সমর্থন জুগিয়ে গেছেন ম্যান্ডেলসন। এরপর গত বছর তাকে বরখাস্ত করেন স্টারমার।
তবে চলতি সপ্তাহে নতুন নথি প্রকাশের পর বিতর্ক আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার চরম মুহূর্তে ম্যান্ডেলসন সম্ভবত গোপন ও শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলা সংবেদনশীল তথ্য এপস্টিনকে পাচার করেছিলেন। এপস্টিন ও তার ওয়াল স্ট্রিটের বন্ধুদের কাছে এই তথ্যের মূল্য ছিল অসীম।
এই অভিযোগের জেরে এখন ফৌজদারি তদন্তের মুখে পড়েছেন ম্যান্ডেলসন। ইতিমধ্যে তিনি হাউজ অব লর্ডস ও লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন। গত বুধবার পার্লামেন্টে স্টারমার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'ম্যান্ডেলসন আমাদের দেশ, পার্লামেন্ট ও দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।'
নিজের বিচারবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্টারমার। এপস্টিনের শিকার হওয়া নারীদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি।
স্টারমার বলেন, 'আমি দুঃখিত। আপনাদের সাথে যা হয়েছে, তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। দুঃখিত যে, ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা আপনাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। ম্যান্ডেলসনের মিথ্যা কথায় বিশ্বাস করে তাকে নিয়োগ দিয়েছিলাম, সে জন্য আমি দুঃখিত।'
তিনি আরও বলেন, 'তবে আমি এটাও বলতে চাই—এ দেশে আমরা চোখ বন্ধ করে থাকব না। কাঁধ ঝেড়ে দায়িত্ব এড়াব না। বিচারকে ক্ষমতাধরদের ইচ্ছেমতো চলতে দেব না। আমরা সত্য খুঁজে বের করব। জনজীবনের সততা রক্ষা করব। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আমাদের ক্ষমতার মধ্যে যা কিছু করা সম্ভব, সবটুকুই করব।'
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন থেকে নথি প্রকাশ হলেও এর উত্তাপ ব্রিটেনে কেন বেশি?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্রিটেনের এই ঝড়ের কারণ শুধু এপস্টিন বা তার নারী পাচারের কেলেঙ্কারি নয়। বরং এটি ব্রিটিশ রাজনীতি, গণমাধ্যম ও জনজীবনে আগে থেকেই চলতে থাকা দীর্ঘমেয়াদি নাটকীয়তাকে আরও উসকে দিয়েছে।
মাত্র দুই বছর আগে বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন কিয়ার স্টারমারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার সময় ফুরিয়ে আসছে। গত বুধবার পার্লামেন্টে তার বিব্রতকর পরিস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছেন। লেবার পার্টির ভেতর থেকেই তার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে—এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকে, তাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপর কী পরিমাণ চাপ থাকে, তা ওয়াশিংটনে বসে বোঝা কঠিন। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের কালো দরজা দিয়ে কোনো নেতা ঢোকার পর থেকেই ওয়েস্টমিনিস্টারে ফিসফাস শুরু হয়ে যায়—তিনি কত দিন টিকবেন!
একসময়ের স্থিতিশীল রাজনীতির দেশ ব্রিটেনে গত ১১ বছরে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা গেছে। এই সময়ের মধ্যে স্টারমারের আগে আরও পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় নিতে হয়েছে। পর্দার আড়ালের ষড়যন্ত্র আর রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এপস্টিন-কাণ্ডের কেন্দ্রে থাকা পিটার ম্যান্ডেলসন—যাকে সমসাময়িকরা ভালোবেসে ডাকতেন 'প্রিন্স অব ডার্কনেস' বা অন্ধকারের রাজপুত্র বলে। অদ্ভুত দক্ষতাসম্পন্ন এই রাজনীতিকের উত্থান যতটা চমকপ্রদ, পতনও ঠিক ততটাই নাটকীয়।
নব্বইয়ের দশকে টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সঙ্গে মিলে ম্যান্ডেলসনই লেবার পার্টিকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। মার্গারেট থ্যাচার ও জন মেজরের কনজারভেটিভ পার্টির কাছে বারবার হেরে কোণঠাসা লেবার পার্টিকে তারা রাজনৈতিক কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ম্যান্ডেলসনের কৌশলে দলটি আবারও নির্বাচনের লড়াইয়ে ফেরে। কিন্তু ম্যান্ডেলসনের একটি দুর্বলতা ছিল—ধনী, বিখ্যাত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই মোহ তাঁকে বারবার কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছে, মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত এপস্টিনের সঙ্গে অভিশপ্ত বন্ধুত্বের ফাঁদেও ফেলেছে।
অন্যদিকে, এপস্টিন-কাণ্ড ব্রিটিশ রাজপরিবারের চিরস্থায়ী নাটকে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। প্রিন্স অ্যান্ড্রুর (বর্তমানে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর) সঙ্গে এপস্টিনের বন্ধুত্বের গল্প অনেক আগে থেকেই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে আসছে। বিশেষ করে অ্যান্ড্রুর নিজের মিথ্যাচার এই আগুন আরও উসকে দিয়েছে। এপস্টিনের পাচারের শিকার ভার্জিনিয়া জিওফ্রের অভিযোগের পর অ্যান্ড্রু যে সমঝোতা করেছিলেন, তা ব্রিটিশদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। যদিও অ্যান্ড্রু কখনোই দোষ স্বীকার করেননি।
তবে এই জেফরি এপস্টিন ঝড়ে স্টারমারের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার খাদের কিনারে চলে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আছেন বেশ ফুরফুরে মেজাজে।
এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের অতীত সখ্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প এখন এতটাই শক্তিশালী যে ওভাল অফিস থেকে তাকে হঠানোর মতো পরিস্থিতি অন্তত এই মুহূর্তে নেই।
ব্যক্তিগত জীবন বা চারিত্রিক প্রশ্নে ট্রাম্পের গায়ে যেন এখন কোনো আঁচই লাগে না। তা ছাড়া ট্রাম্পের আমেরিকায় এখন সংকটের অভাব নেই। মিনেসোটায় অভিবাসনবিরোধী অভিযানে দুই বিক্ষোভকারীর মৃত্যু কিংবা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা তৈরির চেষ্টা—এসব বড় বড় ঘটনার ডামাডোলে এপস্টিন-কাণ্ডের গুরুত্ব যেন অনেকটাই কমে গেছে। এটি মূলত ট্রাম্পের একটি পুরোনো কৌশল—এত বেশি 'শোরগোল' তৈরি করা যাতে ব্যক্তিগত কোনো বিপদ বড় হয়ে দেখা না দেয়।
সংসদীয় ব্যবস্থার কারণেও স্টারমার বেশ চাপে আছেন। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তাকে একের পর এক কড়া ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, সেখানেই তিনি বারবার ঘায়েল হচ্ছেন। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তেমনটা হওয়ার সুযোগ নেই, যেহেতু তিনি মার্কিন কংগ্রেসকে অনেকটা তার অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।
রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসও ট্রাম্পকে বেশ সুরক্ষা দিচ্ছে। হাউজ ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে সাক্ষ্য দিতে তলব করলেও ট্রাম্পকে ডাকার কোনো প্রয়োজন মনে করছেন না। উল্লেখ্য, বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধেও এপস্টিন-কাণ্ডে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মেলেনি এবং তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছেন, ক্লিনটন দম্পতিকে এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে দেখে তার 'খারাপ' লাগছে। তবে ট্রাম্পের এই সহমর্মিতাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দেখছেন অন্যভাবে। ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পারছেন, ক্লিনটনদের সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি এই কেলেঙ্কারিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে, যা ভবিষ্যতে তার নিজের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে এপস্টিন-কাণ্ডে কিয়ার স্টারমার যখন নিজের পদ বাঁচাতে লড়ছেন, ট্রাম্প তখন কৌশলগত অবস্থানে থেকে পুরো বিষয়টি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।
