বুরকিনা ফাসোয় সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করল জান্তা সরকার
বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার সে দেশের সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ২০২২ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকেই দেশটিতে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত ছিল। এবার তা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হলো।
জান্তা প্রধান ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ভিন্নমত দমনের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্তকে ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করার পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমিল জারবো জানিয়েছেন, রাষ্ট্র পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নানা 'অপব্যবহার' হয়েছে। তিনি বলেন, এই ব্যবস্থা নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর শুধু জনসভা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু নতুন আদেশ অনুযায়ী, দলগুলো এখন থেকে আর কোনো কার্যক্রমই পরিচালনা করতে পারবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বিলুপ্ত হওয়া সব রাজনৈতিক দলের সম্পদ এখন থেকে রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে যাবে। এ বিষয়ে খুব দ্রুতই একটি খসড়া আইন অন্তর্বর্তীকালীন আইনসভায় পাঠানো হবে।
২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের আগে বুরকিনা ফাসোয় ১০০টিরও বেশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল। ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ১৫টি দল পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেছিল। তবে বর্তমানে দেশটির শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
'এই সিদ্ধান্ত দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে কোনো সাহায্য করবে না। আমরা এতে মোটেও খুশি নই,' মূলত জান্তা সরকারের ভয়ে নিরাপত্তার খাতিরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে এভাবেই নিজের উদ্বেগের কথা বলছিলেন বুরকিনা ফাসোর এক নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি।
তার মতে, দেশটির জান্তা সরকার সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দিতে চাইছে যে বুরকিনা ফাসোর জন্য গণতন্ত্র এখন 'অকেজো' কিংবা 'ক্ষতিকর'।
ক্যাপ্টেন ত্রাওরে হয়তো লম্বা সময়ের জন্য ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চাইছেন। তবে দেশটির ইতিহাস বলছে, কোনো শাসকই এখানে পুরোপুরি নিরাপদ নন। যেকোনো সময় আবার নতুন কোনো অভ্যুত্থান ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিতর্ক চলছে। তবে জান্তাপন্থীদের অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, বুরকিনা ফাসোর মতো দেশে ১০০টির বেশি রাজনৈতিক দল থাকা মানেই বিশৃঙ্খলা। এতে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি বাড়ে। তাদের মতে, দলগুলো জনসেবার চেয়ে নিজেদের স্বার্থের দিকেই বেশি নজর দেয়।
৩৭ বছর বয়সী ইব্রাহিম ত্রাওরে ২০২২ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন জান্তা প্রধান পল-হেনরি দামিবাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় বসার সময় ত্রাওরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মধ্যে তিনি বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। কিন্তু সেই সময়সীমা আসার ঠিক দুই মাস আগে জান্তা সরকার ঘোষণা করে, তারা আরও অন্তত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকছে।
ত্রাওরের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্য দুর্নাম থাকলেও প্যান-আফ্রিকানিজম বা আফ্রিকান ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি পুরো মহাদেশে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবের বিরুদ্ধে তাঁর কড়া অবস্থান অনেককেই আকৃষ্ট করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে একের পর এক সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। এই দেশগুলোর জান্তা সরকারগুলো প্রায় একই কায়দায় রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সংকুচিত করে আনছে। বুরকিনা ফাসোর এই পদক্ষেপকে সেই আঞ্চলিক অস্থিরতারই নতুন এক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
