যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, কী হতে পারে? সম্ভাব্য সাতটি পরিস্থিতি
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এই হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো মোটামুটি অনুমানযোগ্য, কিন্তু এর পরিণতি কী হবে, তা মোটেই নিশ্চিত নয়। খবর বিবিসির
অতএব, তেহরানের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হলে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার দেশের সামরিক বাহিনীকে সত্যিই হামলার নির্দেশ দেন, তাহলে এর সম্ভাব্য ফলাফল কী কী হতে পারে—তা নিয়ে সাতটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে বিবিসির এক বিশ্লেষণে।
১. সীমিত ও নির্ভুল হামলা, বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কম, গণতন্ত্রে উত্তরণ
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী সীমিত পরিসরে কিন্তু নির্ভুল লক্ষ্যে হামলা চালাতে পারে। লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), আইআরজিসির অধীন আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণকেন্দ্র এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো।
এর ফলে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ইরান হয়তো একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারে; যেখানে দেশটি আবার আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
তবে এটি অত্যন্ত আশাবাদী একটি দৃশ্যপট। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ দেশগুলোর গণতন্ত্রে মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং সেখানে নির্মম স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটলেও তার পরবর্তী সময় ছিল দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতা ও রক্তপাতের। দেশদুটি সম্পূর্ণভাবে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ভেঙে পড়ে।
এর বিপরীতে, ২০২৪ সালে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করা সিরিয়া এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে সেটা এই অর্থে যে কেন্দ্রীয় একটি শাসনব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। যদিও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের আগুনে দেশটির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
২. সরকার টিকে যেতে পারে, তবে নীতিতে নমনীয়তা আসবে
এটিকে সার্বিকভাবে "ভেনেজুয়েলা মডেল" বলা যেতে পারে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ও শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপের পরও সরকার টিকে আছে, তবে তাদের নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
ইরানের ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে— কিন্তু তাদের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন কমাতে বাধ্য করা হবে। পাশাপাশি পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত বা বন্ধ করা হতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনের মাত্রাও কমানো হতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতিটিও বাস্তবসম্মত সম্ভাবনার নিম্ন প্রান্তে অবস্থান করছে।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতৃত্ব গত ৪৭ বছর ধরে পরিবর্তনের প্রতি দৃঢ় প্রতিরোধ দেখিয়েছে। এখন হঠাৎ করে তাদের নীতিগত ইউটার্ন নেওয়ার সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না।
৩. সরকার পতন, সামরিক শাসনের উত্থান
অনেকে মনে করেন, এটি সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি।
যদিও শাসকগোষ্ঠী অনেক ইরানির কাছে অজনপ্রিয় এবং একের পর এক আন্দোলন তাদের অবস্থান দুর্বল করেছে, তবুও ইরানে একটি শক্তিশালী ও বিস্তৃত নিরাপত্তা-রাষ্ট্র কাঠামো রয়েছে, যাদের স্বার্থ বর্তমান শাসন ব্যবস্থার সঙ্গেই জড়িত।
এখন পর্যন্ত ইরানে হওয়া আন্দোলনগুলো সফল না হওয়ার মূল কারণ হলো—ক্ষমতাসীনদের দলে উল্লেখযোগ্য কোনো বিভাজন হয়নি এবং তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে সীমাহীন শক্তি ও নির্মমতা প্রয়োগে পিছপা হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মধ্যে ইরানে এমন একটি শক্তিশালী সামরিক সরকারের উত্থান ঘটতে পারে, যার নেতৃত্বে থাকবেন আইআরজিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা।
৪. যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলা
ইরান আগেই ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা পাল্টা জবাব দেবে—তাদের ভাষায়, "তাদের আঙুল ট্রিগারে রাখা আছে।"
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমানবাহিনীর শক্তির সঙ্গে তুলনায় ইরান দুর্বল হলেও, তাদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যার অনেকগুলো গুহা, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে রাখা আছে।
পারস্য উপসাগরের আরব তীরজুড়ে বাহরাইন ও কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি চাইলে ইরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে; বিশেষত সেইসব আরব দেশের যাদের তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সহযোগী মনে করবে—যেমন জর্ডান।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকোর তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা—যার দায় ইরান-সমর্থিত একটি ইরাকি গোষ্ঠীর ওপর দেওয়া হয়েছিল—রিয়াদকে বুঝিয়ে দেয় তারা ইরানি হামলার কাছে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
এই কারণেই উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, যারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, বর্তমানে চরম উদ্বিগ্ন যে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই পাল্টা আঘাত ডেকে আনবে।
৫. পারস্য উপসাগরে মাইন পেতে প্রতিশোধ
ইরান এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য এটি একটি বড় আশঙ্কা।
১৯৮০–৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরান নৌপথে মাইন পেতেছিল এবং সেগুলো অপসারণে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির মাইনসুইপার জাহাজ ব্যবহার করতে হয়েছিল।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং ২০–২৫ শতাংশ তেল ও তেলজাত পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরান দ্রুত নৌ-মাইন মোতায়েনের মহড়া চালিয়েছে। তেহরান মাইনের জাল বেছালে বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের দামে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।
৬. ইরানের পাল্টা হামলায় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা
পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের একজন ক্যাপ্টেন একসময় বলেছিলেন, ইরানের সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকি হিসেবে তিনি যেটিকে দেখেন, তা হলো "ঝাঁক আক্রমণ" বা সোয়ার্ম অ্যাটাক।
এতে ইরান একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ও দ্রুতগতির টর্পেডো বোট পাঠাবে। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এর সবগুলো ধবংস করতে পারবে না। ফলে এই বাধা অতিক্রম করে কোনো যুদ্ধজাহাজে এসব ড্রোন আঘাত হানতে পারে।
পারস্য উপসাগরে প্রচলিত ইরানি নৌবাহিনীর বদলে এখন কার্যত আইআরজিসি নৌবাহিনীই সক্রিয়, যার কয়েকজন কমান্ডার ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন।
এই বাহিনী মূলত অসম বা অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধকৌশলে দক্ষ—যার লক্ষ্য প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পাশ কাটিয়ে আঘাত করা।
একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়া এবং এর নাবিকদের বন্দি হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম অপমান হবে।
যদিও এই পরিস্থিতি অল্প সম্ভাবনার, তবুও ২০০০ সালে এডেন বন্দরে আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলায় ইউএসএস কোল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৭ জন নাবিক নিহত হন। তারও আগে, ১৯৮৭ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ভুলবশত একটি ইরাকি যুদ্ধবিমান ইউএসএস স্টার্ক জাহাজকে লক্ষ্য করে দুটি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, এতে ৩৭ জন নাবিক নিহত হন।
৭. সরকার পতন, কিন্তু দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা
এটি একটি অত্যন্ত বাস্তব ও ভয়াবহ আশঙ্কা—বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য।
ইরানে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনার পাশাপাশি—যেমন সিরিয়া, ইয়েমেন বা লিবিয়ায় দেখা গেছে—কুর্দি, বালুচি ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে, যদি কেন্দ্রীয় শাসন ক্ষমতা ভেঙে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন দেখতে চাইবে—বিশেষ করে ইসরায়েল, যারা ইতোমধ্যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর বড় আঘাত হেনেছে এবং ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে।
তবে নিকট প্রতিবেশীদের কেউই চাইবে না যে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনবহুল দেশ—প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের আবাসভূমি—বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হোক এবং একটি মানবিক ও শরণার্থী সংকট তৈরি করুক।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সীমান্তের কাছে এত বিশাল সামরিক শক্তি জড়ো করার পর হয়তো মনে করবেন—কিছু না করলে তার আর মুখরক্ষা হচ্ছে না। তখন এমন একটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যার কোনো স্পষ্ট শেষ নেই। এমন সংঘাতের পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ ও অনিশ্চিত।
