ইরাকের তেল বিক্রির আয় যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে যুক্তরাষ্ট্র
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর থেকেই দেশটির তেলের আয়ের ডলারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে বাগদাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে এক অসাধারণ ক্ষমতা। এমনকি ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণেও এর প্রভাব স্পষ্ট।
মূলত নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমেই ইরাকের তেলের আয়ের ব্যবস্থাপনা করে আমেরিকা। ২০০৩ সালের আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন 'কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি' (সিপিএ) ইরাকের জন্য একটি উন্নয়ন তহবিল (ডিএফআই) গঠন করে। এই তহবিলটি নিউ ইয়র্ক ফেড-এ রাখা হয়।
এর উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেলের টাকা জমা করা এবং দেশটির পুনর্গঠন ও উন্নয়নে তা ব্যবহার করা। সাদ্দাম হোসেনের আমলের মামলা ও দাবিদাওয়ার হাত থেকে এই আয়কে রক্ষা করাও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ সংক্রান্ত একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছিলেন। এরপর সব প্রেসিডেন্টই এর মেয়াদ বাড়িয়েছেন। বর্তমানে এই তহবিলটি নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট হিসেবেই রয়ে গেছে।
আমেরিকার হাতে কেমন ক্ষমতা?
ইরাকের আয়ের প্রধান উৎস তেল। দেশটির বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে এখান থেকে। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ওয়াশিংটনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
২০২০ সালের একটি ঘটনার কথা বলা যাক। তখন ইরাক সরকার মার্কিন সেনাদের দেশ ছাড়তে বলেছিল। জবাবে ওয়াশিংটন হুমকি দেয় যে, তারা নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে থাকা ইরাকের তহবিলের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেবে। শেষমেশ বাগদাদ পিছু হটতে বাধ্য হয়। যদিও মার্কিন দখলের শুরুর বছরগুলোর তুলনায় ইরাক এখন তাদের আর্থিক বিষয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্ক প্রমাণ করে যে, ইরাক যতই সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার কথা বলুক না কেন, দেশটির অর্থনীতির লাগাম আমেরিকার হাতেই রয়ে গেছে।
কেন এতদিন ধরে এই ব্যবস্থা টিকে আছে?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থা ইরাকের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থকে সুরক্ষিত রাখে। তেলের আয়ের ব্যবস্থাপনার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরি করে এবং বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার পাওয়া সহজ করে।
ঋণদাতা ও মামলাকারীদের হাত থেকেও এই অর্থ নিরাপদ থাকে। কর্মকর্তারা আরও জানান, এই ব্যবস্থা টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে এবং ইরাকি অর্থনীতির ওপর আস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে কাজ করছে। ইরান-সমর্থিত কিছু গোষ্ঠী ডলার পাওয়ার বিধিনিষেধ কমাতে চায়। এই ব্যবস্থার ফলে সরকার তাদের চাপও সামলাতে পারে। গত বছর আমেরিকা ইরাকের কিছু ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অভিযোগ ছিল, তারা ইরানের জন্য অর্থ পাচার করছিল।
ইরাকের ওপর এর প্রভাব
ইরাকে মার্কিন ডলার সরবরাহে কড়াকড়ির কারণে একটি সমান্তরাল বা অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সরকারি রেট এবং কালোবাজারের রেটের মধ্যে পার্থক্য দেখা দিয়েছে। এই দামের পার্থক্য মূলত আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের ঝুঁকির মাশুল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ইরানের ওপর 'সর্বোচ্চ চাপ' প্রয়োগের নীতি নিয়েছেন। এতে প্রায়ই দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে ইরাক। কারণ তেহরান ইরাককে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ 'অর্থনৈতিক ফুসফুস' হিসেবে ব্যবহার করে।
তেলের আয়ের বর্তমান অবস্থা কী?
ইরাকের তেলের আয় এখনো নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের জিম্মায় রয়েছে। ডলার সরবরাহের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতদিন ডলার নিলাম বা 'ফরেন কারেন্সি উইন্ডো' ব্যবহার করত। বেসরকারি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো প্রতিদিন ইরাকি দিনার দিয়ে মার্কিন ডলার কিনত।
তবে আমেরিকার প্রবল চাপে ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিলাম পদ্ধতি বন্ধ করে দেয়। মূলত নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বিভিন্ন সত্তার কাছে ডলার পাচার ঠেকানোর অংশ হিসেবেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের কাছে ডলার যাওয়া বন্ধ করাই এর লক্ষ্য।
