মার্কিন কংগ্রেস কি পারবে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল থামাতে?
গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় আনতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ ইতোমধ্যেই মার্কিন কংগ্রেস বা প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মাঝে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বাড়ছে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেক আইনপ্রণেতা।
তবে গ্রিনল্যান দখল ঠেকাতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যথেষ্ট সংখ্যক রিপাবলিকান যুক্ত হবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে—কংগ্রেসের চাপের কাছে ট্রাম্প নতি স্বীকার করবেন, নাকি তার দ্বিতীয় মেয়াদে যেমনটি তিনি একাধিকবার করেছেন, তেমনি একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন?
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে আলোচনাটি এখন আরও বিস্তৃত হয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ভেনেজুয়েলা, ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তারে—কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে রিপাবলিকানরা মূলত তার পররাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। তবে এখন রিপাবলিকানদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এবং ন্যাটো জোটের মিত্রদের সঙ্গে ঐকমত্য হচ্ছেন, যারা বলছেন—গ্রিনল্যান্ড দখল যুক্তরাষ্ট্রের ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছু রিপাবলিকান নেতা বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড কেনা বা সামরিক শক্তি দিয়ে দখল করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন স্বার্থ নেই। একই সঙ্গে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের নতুন এক পরিকল্পনার বিরোধিতায় ডেমোক্র্যাটদের পাশে দাঁড়িয়েছেন—যে পরিকল্পনায় গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে সমর্থন না দেওয়া ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড স্বশাসিত হলেও এটি ইউরোপীয় মিত্র ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন।
নর্থ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের সিনেটর থম টিলিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, প্রস্তাবিত এই শুল্ক ব্যবস্থা হবে "আমেরিকার জন্য খারাপ, মার্কিন ব্যবসার জন্য খারাপ এবং আমেরিকার মিত্রদের জন্যও ক্ষতিকর।" তিনি আরও বলেন, এতে চীন ও রাশিয়া লাভবান হবে। "এটা পুতিন, শি এবং ন্যাটোকে বিভক্ত দেখতে চাওয়া অন্যান্য প্রতিপক্ষদের জন্য দারুণ খবর।"
অন্য রিপাবলিকানরা বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এমন এক সময়ে ন্যাটো জোটকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক—উভয়ই ন্যাটোর সদস্য।
মার্কিন সিনেটের আর্কটিক ককাসের সহসভাপতি সিনেটর লিসা মারকাউস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, "গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রশ্নাতীত হওয়া উচিত।"
কিন্তু, ট্রাম্পের যুক্তি—আর্কটিক অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের অবশ্যই গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা প্রয়োজন। তিনি দ্বীপটি "যেভাবেই হোক" নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছেন।
মঙ্গলবার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চলমান উত্তেজনায় ন্যাটোর ক্ষতি হচ্ছে কি না—এমন উদ্বেগকে খাটো করে দেখান। গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে তার প্রচেষ্টার কারণে কয়েক দশকের পুরোনো ন্যাটো জোট ভেঙে পড়লেও তিনি তা মেনে নিতে প্রস্তুত কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, "জাতীয় নিরাপত্তা এমনকি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও আমাদের [গ্রিনল্যান্ড] প্রয়োজন।"
তবে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান ক্যাপিটল হিলে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
যদি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান, তাহলে ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কংগ্রেসের হাতে কিছু বিকল্প রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারকে অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তাত্ত্বিকভাবে গ্রিনল্যান্ড কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ অনুমোদন দিতে হবে কংগ্রেসকেই। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড—উভয়ই স্পষ্ট করে বলেছে, দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়।
আমেরিকান গভর্ন্যান্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও কংগ্রেসীয় প্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল শুমান বলেন, "ট্রাম্প যদি গ্রিনল্যান্ড কিনতে চান, তাহলে সে জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে কংগ্রেসের আইন প্রয়োজন হবে।" তিনি যোগ করেন, বিদ্যমান তহবিল অন্য খাতে দিয়ে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কংগ্রেসের পক্ষে সহজ হবে না।
তবে অভিবাসন ও শুল্ক নীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ট্রাম্প প্রশাসন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার বাড়িয়েছে। শুমানের মতে, কংগ্রেসের বাধা অতিক্রম করতে গ্রিনল্যান্ড দখলের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন নতুন কোনো কর্তৃত্ব দাবি করার চেষ্টা করতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান নিয়ে উদ্বিগ্ন আইনপ্রণেতারা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো মার্কিন পদক্ষেপ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে এসব প্রস্তাব পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই পাস করার মতো পর্যাপ্ত রিপাবলিকান সমর্থন পাবে কি না, তা অনিশ্চিত।
এই মাসের শুরুতে পাঁচজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে এমন একটি বিল এগিয়ে নেন, যা ডিসেম্বরের হামলার পর ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান বাড়ানো থেকে প্রশাসনকে বিরত রাখবে। ওই হামলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হন।
ভেনেজুয়েলা বিষয়ক যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত সিনেটে পাস হয়নি। ২০২৪ সালে নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাম্প বিদেশের মাটিতে কোনো সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু এরপরেও ক্ষমতায় এসে তার সামরিক শক্তি প্রয়োগ নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষের মধ্যেই বাড়তে থাকা অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয় এ প্রস্তাব। এরমধ্যেই গত সপ্তাহে একটি দ্বিদলীয় কংগ্রেসীয় প্রতিনিধি দল প্রতীকীভাবে গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানাতে ডেনমার্ক সফর করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে যদি গ্রিনল্যান্ডের পুরোটা বা অংশবিশেষ ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়, সে ক্ষেত্রে চুক্তি অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সিনেট কী অবস্থান নেবে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
১৯৫১ সালে ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিদ্যমান চুক্তি রয়েছে, যা গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ দেয়। মারকাউস্কি ও অন্য রিপাবলিকানদের মতে, এই চুক্তির সুবাদে ওই অঞ্চলে জাতীয় নিরাপত্তার চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রয়োজন নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কোনো চুক্তি হলে সিনেট সেটির বিরোধিতা করে ট্রাম্পের উদ্যোগ আটকে দিতে পারে। চুক্তি অনুমোদনের জন্য সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন, যা বর্তমানে রিপাবলিকানদের নেই।
কিছু রিপাবলিকান ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে তারা ট্রাম্পের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন। কেন্টাকির সিনেটর মিচ ম্যাককনেল—সিনেটের সাবেক সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা—সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিনল্যান্ড দখল করলে তা "মিত্রদের আস্থাকে চূর্ণ করবে।"
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে রিপাবলিকানদের উদ্বেগ বাড়তে থাকায় ট্রাম্প এমন কোনো সমঝোতার পথে যেতে পারেন, যা আনুষ্ঠানিক চুক্তির পর্যায়ে যাবে না এবং সিনেটের অনুমোদনও লাগবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের মতামত ছাড়াই প্রেসিডেন্টদের এ ধরনের চুক্তি করার ক্ষমতা আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক জশ চাফেটজ বলেন, "অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তিই আনুষ্ঠানিক চুক্তির বাইরে ভিন্ন রূপে সম্পন্ন হয়। তবে এত বড় পরিসরের বিষয় কেবল নির্বাহী সমঝোতা হিসেবে সম্পন্ন করা সম্ভব—এ নিয়ে আমি সন্দিহান।"
মঙ্গলবারের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেননি, গ্রিনল্যান্ড দখলের পথে তিনি কোনো আইনি বা রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতায় বাঁধা আছেন কি না। তিনি কত দূর যেতে প্রস্তুত—এই প্রশ্নে সাংবাদিকদের তিনি অপেক্ষা করতে বলেন।
ট্রাম্প বলেন, "আমি মনে করি এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যা সবার জন্যই খুব ভালো হবে।"
