যে কারণে এখন বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতারা জাঁকজমকপূর্ণ আকাশচুম্বী ভবন গড়ছে
বুগাটি নামটির সঙ্গে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ও অত্যন্ত দামি সুপারকারের ভাবমূর্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তবে এই বিলাসবহুল ফরাসি ব্র্যান্ডটি এখন একেবারে ভিন্ন এক প্রতিযোগিতায় নামছে—গাড়ির রেস ট্র্যাকে নয়, বরং শহরের আকাশছোঁয়া ভবন নির্মাণে। খবর বিবিসি'র।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের প্রাণকেন্দ্রে বুগাটি তাদের প্রথম আবাসিক টাওয়ার নির্মাণ করছে। এই প্রকল্পে সবচেয়ে কম দামের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ধরা হয়েছে ৫.২ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩.৯ মিলিয়ন পাউন্ড)। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অতি-ধনাঢ্য ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে দ্রুত সম্প্রসারণশীল 'ব্র্যান্ডেড রেসিডেন্স' বা ব্র্যান্ডযুক্ত আবাসনের বাজারে প্রবেশ করছে।
পোর্শে ও অ্যাস্টন মার্টিনের মতো অন্যান্য গাড়ি নির্মাতাসহ বহু বিলাসবহুল ব্র্যান্ডও এখন এ ধরনের ভবন নির্মাণে যুক্ত হচ্ছে। সাধারণত এসব প্রকল্পে জাঁকজমকপূর্ণ, আসবাবপত্রে সুসজ্জিত ফ্ল্যাট অফার করা হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ব্র্যান্ড নাম বা লোগো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং বারবার প্রদর্শিত থাকে।
এই খাতে প্রবেশ করা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সুইস ঘড়ি নির্মাতা জ্যাকব অ্যান্ড কোং এবং ইতালীয় ফ্যাশন হাউজ ফেন্ডি ও মিসোনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান বিংহাত্তি প্রপার্টিজের সঙ্গে অংশীদারত্বে বুগাটি দুবাইতে ৪৩ তলা বিশিষ্ট এই টাওয়ারটি নির্মাণ করছে। 'বুগাটি রেসিডেন্সেস বাই বিংহাত্তি' নামে পরিচিত ভবনটির সবচেয়ে দামি পেন্টহাউজগুলোতে মালিকদের গাড়ির জন্য থাকবে বিশাল ব্যক্তিগত লিফট, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরেই গাড়ি পার্ক করতে পারবেন।
বিংহাত্তি প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ বিংহাত্তি বলেন, 'অনেক গাড়ি বা ঘড়িপ্রেমীর কাছে এটি শুধু সেই গাড়ি বা ঘড়িটির মালিক হওয়া নয়; বরং রিয়েল এস্টেট বা আবাসনের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে সেই ব্র্যান্ডটিকে অনুভব করার সুযোগ।'
তিনি আরও জানান, বুগাটির এই প্রকল্পের ক্রেতাদের তালিকায় রয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তারকা নেইমার জুনিয়র ও অপেরা গায়ক আন্দ্রেয়া বোচেলি। শোনা যাচ্ছে, নেইমার একটি পেন্টহাউজের জন্য ৫৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন।
আবাসন খাতের এজেন্ট প্রতিষ্ঠান নাইট ফ্রাঙ্কের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডেড বাসস্থানের চাহিদা 'গতি পেয়েছে'। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে এ ধরনের প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ১৬৯টি, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১১টিতে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ১,০১৯-এ পৌঁছাতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি ও নিউইয়র্কে আকাশচুম্বী ভবনকেন্দ্রিক ব্র্যান্ডেড অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে নাইট ফ্রাঙ্কের মতে, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মধ্যপ্রাচ্যেই সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তাদের ভাষায়, 'সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরবে দ্রুত সম্প্রসারণের' ফলেই এই প্রবৃদ্ধি।
নাইট ফ্রাঙ্ক মিডল ইস্টের গবেষণা প্রধান ফয়সাল দুররানি বলেন, 'যাদের মধ্যে কোনো ব্র্যান্ডের প্রতি চরম আনুগত্য রয়েছে, তাদের কাছেই ব্র্যান্ডেড বাসস্থান সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এরা এমন মানুষ, যারা একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের মধ্যেই জীবন কাটাতে চান।'
আবাসন খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান স্যাভিলসের পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণাধীন ব্র্যান্ডেড আবাসন প্রকল্পের সংখ্যার বিচারে শহর হিসেবে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে দুবাই।
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুলসংখ্যক ধনী ব্যক্তি দুবাইয়ে বসতি গড়া এবং বিলাসবহুল বাড়ি কেনার ফলেই এই খাতে এমন রমরমা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দুররানি আরও বলেন, বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় স্বল্প-কর সুবিধার কারণে দুবাইতে ব্র্যান্ডেড অ্যাপার্টমেন্টের দাম প্রায়ই কম হয়। নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মতো শহরের তুলনায় দুবাইয়ের এ ধরনের সম্পত্তির দামকে তিনি 'অত্যন্ত সাশ্রয়ী' বলে বর্ণনা করেন।
কিছুদিন আগপর্যন্ত ব্র্যান্ডযুক্ত আবাসন খাতটি মূলত ফোর সিজনস ও রিটজ-কার্লটনের মতো অভিজাত হোটেল চেইনগুলোর দখলেই ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হোটেল খাতের বাইরের অন্যান্য বিলাসবহুল ব্র্যান্ডও নতুন নতুন আবাসন প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে পোর্শের ডিজাইন টাওয়ার চালু হয় ২০১৭ সালে। আর গত বছর সেখানে উদ্বোধন করা হয়েছে অ্যাস্টন মার্টিনের 'রেসিডেন্সেস মায়ামি'। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মারজান দ্বীপে জ্যাকব অ্যান্ড কোং-এর আবাসন প্রকল্পটি ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে আয়ের একটি নতুন সুযোগ। কারণ, প্রকল্পের নির্মাণকাজের দায়ভার থাকে ডেভেলপার বা আবাসন নির্মাতা অংশীদারদের ওপর। আর ক্রেতারা সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের সৌন্দর্য, মর্যাদা ও আভিজাত্যের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বা প্রিমিয়াম দিতে আগ্রহী হন।
বিংহাত্তির মতে, সাধারণ বিলাসবহুল আবাসনের তুলনায় ব্র্যান্ডেড অ্যাপার্টমেন্টের দাম সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়।
অনেক নতুন ব্র্যান্ডেড প্রকল্পে ব্যক্তিগত সদস্যদের ক্লাব, শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা এবং নানা ধরনের বিশেষ সেবা যুক্ত করা হচ্ছে। এসব সেবার মধ্যে চালকসহ গাড়ি ব্যবহার, ব্যক্তিগত ইয়টের [প্রমোদতরী] সুযোগ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত বিমানের [প্রাইভেট জেট] সুবিধাও রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যান্ডেড বাসস্থানের একটি নতুন ধারা ভোজনবিলাস, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং এমনকি দীর্ঘায়ু–সংক্রান্ত বিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে প্রচার করা হচ্ছে।
লন্ডনের বেইসওয়াটারে সিক্স সেন্সেস হোটেল চেইন নির্মাণ করছে 'সিক্স সেন্সেস রেসিডেন্সেস'। সেখানে থাকবে একটি 'বায়োহ্যাকিং সেন্টার'। এই কেন্দ্রে ক্রায়োথেরাপিসহ বিভিন্ন ধরনের থেরাপি দেওয়া হবে, যেখানে অতিরিক্ত ঠান্ডা ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়। দাবি করা হচ্ছে, এসব থেরাপি শরীরের শক্তি বাড়াতে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ডিসকভারি ল্যান্ড কোম্পানি তাদের আসন্ন আবাসন প্রকল্প 'অস্টিন সার্ফ ক্লাব' গড়ে তুলছে মানুষের তৈরি বিশাল এক সার্ফিং লেগুনকে কেন্দ্র করে।
ব্যবসা ও ভোক্তা মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলাসবহুল ব্র্যান্ডেড অ্যাপার্টমেন্টের এই উত্থান মূলত সমাজে নিজের অবস্থান জানান দেওয়া (সোশ্যাল সিগন্যালিং) এবং স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।
কিংস কলেজ লন্ডনের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক জিয়ানা একহার্ড বলেন, দুষ্প্রাপ্য হ্যান্ডব্যাগ বা বিশাল হীরার আংটির মতোই এই ধরনের বাসস্থান এখন 'সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি' হিসেবে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, 'অতি-ধনী ক্রেতারা ক্রমেই এমন সম্পদ ও পণ্য খুঁজছেন, যা সবার নাগালের মধ্যে নয়।'
ক্রেতার আচরণ, ব্র্যান্ডিং ও ভোক্তা সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো 'সামাজিক স্তরে একজন ব্যক্তির অবস্থান' স্পষ্ট করে তোলে। তার ভাষায়, 'এই ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকলে সামাজিকভাবে যে বাড়তি কদর বা স্বীকৃতি পাওয়া যায়, সেটাই তারা চান।'
বিংহাত্তিও মনে করেন, এই স্বাতন্ত্র্য বা আভিজাত্যই ব্র্যান্ডেড আবাসনের মূল আকর্ষণ। তিনি বলেন, 'গ্রাহকরা এখানে সত্যিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বকীয়তা পান।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রতিটি ইউনিটই আলাদা, যা ক্রেতাদের মধ্যে এমন এক অনুভূতি তৈরি করে যে, পুরো পৃথিবীতে তাদের মালিকানাধীন এই অ্যাপার্টমেন্টটি একেবারেই অনন্য।'
তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পার্ন কানডোলার ব্যবসায়িক মনোবিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ডাফ সতর্ক করে বলেছেন, সবার কাছেই ব্র্যান্ডেড অ্যাপার্টমেন্টের ধারণাটি যে রুচিসম্মত বলে মনে হবে, তা নয়—বিশেষ করে যেখানে ব্র্যান্ডের নাম অতিরিক্তভাবে প্রদর্শিত হয়।
তিনি বলেন, 'একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সর্বত্র যদি কোনো ব্র্যান্ডের উপস্থিতি চোখে পড়ে, তাহলে তা এর দুষ্প্রাপ্যতা ও অনন্যতার অনুভূতি কমিয়ে দিতে পারে এবং লোক দেখানো বড়াই বলে মনে হতে পারে। আর সবচেয়ে খারাপ ক্ষেত্রে, এটিকে জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ বলেও বিবেচনা করা হতে পারে।'
