ভেপার ধরিয়ে দিতে হটলাইন, ধরা পড়লে বেত্রাঘাত: ই-সিগারেটের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরের 'যুদ্ধঘোষণা'
সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া সীমান্তের প্রধান স্থলপথ উডল্যান্ডস চেকপয়েন্ট। সারা দিনই ব্যস্ত থাকে এই সীমান্ত। হাজার হাজার গাড়ি ধীরগতিতে পার হচ্ছে। কাস্টমস কর্মকর্তা বেলিন্ডা লিয়াও ও তাঁর দল তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন প্রতিটি গাড়ির ওপর।
হঠাৎ একটি সাদা টয়োটা ভ্যানকে থামার সংকেত দিলেন লিয়াও। মুহূর্তের মধ্যে তার দলের সদস্যরা ভ্যানটি ঘিরে ফেললেন। হাতে নীল গ্লাভস। তারা ভ্যানের চেসিসে টোকা দিয়ে পরীক্ষা করছেন—ভেতরে কোনো গোপন চেম্বার বা কুঠুরি আছে কি না। অন্যরা চালককে জেরা করছেন, তার জিনিসপত্র তছনছ করে খুঁজছেন, এমনকি মোবাইল ফোনও ঘেঁটে দেখছেন।
মূলত তারা খুঁজছেন ভেইপ বা ই-সিগারেট। গত কয়েক মাস ধরেই সিঙ্গাপুর সরকার এর বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
সিঙ্গাপুরে ২০১৮ সাল থেকেই ভেইপ বা ই-সিগারেট নিষিদ্ধ। কিন্তু সম্প্রতি কালোবাজারে মাদকমিশ্রিত ভেইপের রমরমা বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলো 'কে-পডস' নামে পরিচিত। মাদক নিয়ন্ত্রণে 'জিরো টলারেন্স' এর জন্য পরিচিত দেশটির সরকারের কপালে তাই চিন্তার ভাঁজ।
কর্তৃপক্ষ এখন কঠোর অবস্থানে। শাস্তির বিধানও করা হয়েছে কড়া, আসছে আরও নতুন আইন। এখন সিঙ্গাপুরে কারও কাছে ই-সিগারেট পাওয়া গেলে তার হতে পারে জেল, পাঠানো হতে পারে সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে। এমনকি জুটতে পারে বেত্রাঘাতের সাজাও। ভেইপিংয়ের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে পুরো দেশজুড়ে চলছে বিশাল জনস্বাস্থ্য প্রচারভিযান।
বিশ্বের অনেক দেশই যখন ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার কথা ভাবছে, ঠিক তখনই সিঙ্গাপুর এমন পদক্ষেপ নিল। একটি বুলেটিনে সিঙ্গাপুরের এই প্রচারভিযানকে 'টার্নিং পয়েন্ট' হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বলছে, আগামী এক দশকে বৈশ্বিক তামাক ও মাদক নীতিতে এর প্রভাব পড়বে।
এখন প্রশ্ন হলো, অন্য দেশগুলোও কি সিঙ্গাপুরের এই পথ অনুসরণ করবে?
পাউরুটির ভেতরেও ভেইপ
'ঠিক আছে, আপনি যেতে পারেন।'
উডল্যান্ডস চেকপয়েন্টে তল্লাশি শেষে ওই চালককে ছেড়ে দিলেন লিয়াও এবং তার দলের সদস্যরা।
গাড়িটিতে অবৈধ কিছু মেলেনি।
সিঙ্গাপুরে বেশির ভাগ ভেইপ বা ই-সিগারেট ঢোকে মালয়েশিয়া থেকে। লিয়াও জানান, তারা একবার এসি ও বৈদ্যুতিক সুইচের কার্টনের ভেতরেও ভেইপের চালান পেয়েছিলেন। আরেকবার একটি রুটির গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দেখেন, পাউরুটির ট্রের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে হাজার হাজার ভেইপ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চোরাকারবারিরা কৌশল বদলেছে। বড় চালানের বদলে এখন তারা গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে অল্প অল্প করে ভেইপ আনছে। এ কারণেই কাস্টমস কর্মকর্তারা গাড়ির গায়ে টোকা দিয়ে দিয়ে ফাঁপা জায়গা বা গোপন কুঠুরি খোঁজার চেষ্টা করেন।
চেকপয়েন্টের অন্য প্রান্তে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। সেখানে বড় লরিগুলোকে বিশাল এক্স-রে মেশিনে স্ক্যান করা হচ্ছে। এরপর কর্মকর্তারা লরির ভেতরে ঢুকে পণ্য পরীক্ষা করছেন। ছোট চাকু দিয়ে প্লাস্টিকের মোড়ক কেটে টর্চলাইটের আলোয় তারা ভালো করে দেখে নিচ্ছেন—ভেতরে সন্দেহজনক কিছু আছে কি না।
লিয়াও বলেন, 'চোরাকারবারিদের পদ্ধতি পাল্টাচ্ছে, তাই আমরাও পাল্টাচ্ছি। ভেইপ আসা ঠেকাতে এবং আরও বেশি চালান শনাক্ত করতে আমাদের এখন কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে।'
'কে-পডস' আতঙ্ক ও সরকারি অ্যাকশন
স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা চিন্তা করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ২০১৮ সালেই সিঙ্গাপুরে ভেইপ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সরকার তখন জানিয়েছিল, তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ হবে।
কিন্তু অনলাইনে ই-সিগারেটের চোরাকারবার থামেনি। সিঙ্গাপুরের ভেইপ ব্যবহারকারীরা বিবিসিকে জানান, ২০১৮ সালের পরেও তাঁরা বিভিন্ন ফোরাম ও চ্যাট অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই ভেইপ কিনতে পারতেন।
তবে সম্প্রতি কালোবাজারের এই 'কে-পডস' মূলত ইটোমিডেট নামের একধরনের চেতনানাশক মেশানো ভেইপ। এর প্রভাব অনেকটা কেটামিনের মতো, যা মানুষকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
কিছুদিনের মধ্যেই 'কে-পডস' টেনে রাস্তাঘাটে তরুণদের অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা অসংলগ্ন আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে থাকে। গত জুলাইয়ে জব্দ করা ১০০টি ভেইপ পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলোর এক-তৃতীয়াংশেই ইটোমিডেট মেশানো ছিল।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সিঙ্গাপুরের কঠোর সুনাম আছে। এমনকি গাঁজা সেবনের জন্যও সেখানে কঠিন শাস্তি হয়, আর পাচারকারীদের জন্য রয়েছে মৃত্যুদণ্ড। সেই দেশে এমন ঘটনা সবাইকে চমকে দেয়।
কর্তৃপক্ষ দ্রুত নড়েচড়ে বসে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং ঘোষণা দেন, ভেইপিং এখন আর সাধারণ বিষয় নয়, এটি মাদকের সমস্যা। তার সরকার শুধু 'কে-পডস' নয়, সব ধরনের ভেইপের বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
গত আগস্টে লরেন্স ওং সতর্ক করে বলেন, 'ভেইপ তো শুধু মাধ্যম। আসল বিপদ হলো এর ভেতরে কী থাকছে, সেটা। এখন থাকছে ইটোমিডেট। ভবিষ্যতে হয়তো আরও ভয়াবহ কোনো মাদক এর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।'
গত সেপ্টেম্বরে ভেইপ ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন শাস্তির বিধান চালু করে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো এবং ১০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার পর্যন্ত জরিমানা।
বিক্রেতাদের জন্য শাস্তি আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে যাদের কাছে মাদকমিশ্রিত ভেইপ পাওয়া যাবে, তাদের ২০ বছর পর্যন্ত জেল এবং ১৫ ঘা পর্যন্ত বেত্রাঘাতের সাজা হতে পারে। সিঙ্গাপুরে বেত্রাঘাত একটি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, যেখানে অপরাধীর নিতম্বে সজোরে বেত মারা হয়। বিদেশিরাও এই শাস্তির আওতাভুক্ত। পাশাপাশি তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
স্কুলগুলোতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থীর কাছে ভেইপ পাওয়া গেলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত, বহিষ্কার, এমনকি বেত্রাঘাতও করা হতে পারে। আগামী কয়েক মাসে আরও নতুন আইন আসছে।
শাস্তি এড়াতে কেউ চাইলে স্বেচ্ছায় নিজের ভেইপ জমা দিতে পারেন। এ জন্য দ্বীপজুড়ে বসানো হয়েছে 'ভেইপ বিন'। পাশাপাশি বাস ও মেট্রো স্টেশনে চলছে ঝটিকা অভিযান ও ব্যাগ তল্লাশি। ভেইপ ব্যবহারকারীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য চালু করা হয়েছে হটলাইন। প্রথম ৯ সপ্তাহে সেখানে আড়াই হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে চলছে ভেইপবিরোধী ব্যাপক প্রচারভিযান। গণমাধ্যম, বিলবোর্ড এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সবর্ক্ষণ প্রচার চালানো হচ্ছে। তরুণদের আকৃষ্ট করতে জনপ্রিয় সিনেমা ও টিভি শোর প্রসঙ্গ টেনে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
জনপ্রিয় সিরিজের আদলে সতর্কতা
তরুণদের সচেতন করতে জনপ্রিয় সিনেমা ও টিভি সিরিজের আদলে তৈরি করা হয়েছে বিজ্ঞাপন। একটি বিজ্ঞাপনের স্লোগান দেওয়া হয়েছে—'ফাইনাল ডেস্টিনেশন—আইসিইউ'। নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ 'স্ট্রেঞ্জার থিংস'-এর অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে 'ডেনজার থিংস'। সেখানে ভেইপ ব্যবহারকারীদের জম্বির মতো দেখানো হয়েছে। আবার মাদক নিয়ে তৈরি বিখ্যাত সিরিজ 'ব্রেকিং ব্যাড'-এর প্যারোডি করে বানানো হয়েছে 'ব্রেকিং ড্যাড'।
এসব বিজ্ঞাপনে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব সত্য ঘটনা। যেমন, 'কে-পডস' টেনে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ওপর থেকে পড়ে এক কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনা। কিংবা এক ভেইপ ব্যবহারকারীর কথা, যার ফুসফুস চারবার ওয়াশ বা পরিষ্কার করতে হয়েছে।
পুলিশ বলছে, তাদের এই ধরপাকড় ও প্রচারণায় কাজ হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে ভেইপ ব্যবহারের অপরাধে প্রায় দুই হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, এখন জব্দ করা ই-সিগারেটের ১০ ভাগের ১ ভাগেরও কম মাদকমিশ্রিত।
সিঙ্গাপুরের সাধারণ মানুষ বরাবরই মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান সমর্থন করে। তাই প্রকাশ্যে এই অভিযানের বিরোধিতা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তবে অনলাইনে বা আড়ালে কেউ কেউ বলছেন, কড়াকড়িটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে।
মাইকেল (ছদ্মনাম) নামের এক ভেইপ ব্যবহারকারী বলেন, 'সরকার জোর করে আমাদের ভেইপ ছাড়াতে চাইছে, এটা ঠিক নয়। সিগারেটও তো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু সেটা তো বৈধ। ভেইপ কেন পুরোপুরি নিষিদ্ধ হবে? এটা আসলে সরকারের অলস নীতি... মানুষের হাতেই নির্বাচনের সুযোগ থাকা উচিত।'
টোবি (ছদ্মনাম) নামের আরেকজন অবশ্য স্বীকার করছেন, কিশোরদের মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপ দরকার ছিল। বিষয়টিকে তিনি 'সাপের মাথা কেটে ফেলা'র সঙ্গে তুলনা করেন। তবে তাঁর আক্ষেপ, 'একের পাপে সবার শাস্তি হচ্ছে। যারা মাদক নেয় না, তারাও এখন ভুক্তভোগী।' টোবি জানান, তিনি এখন আবার সাধারণ সিগারেটে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলছেন, ২০১৮ সালে ভেইপ নিষিদ্ধ করার কারণেই কি আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? স্বাধীন সাময়িকী 'জোম'-এর এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার ফলেই কালোবাজারিরা বেশি লাভের আশায় 'কে-পডস'-এর মতো মাদকমিশ্রিত ও আসক্তিকর পণ্য বানাতে উৎসাহিত হয়েছে।
তবে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের 'স সিয়ে হক স্কুল অব পাবলিক হেলথ'-এর ডিন থিও ইয়েক ইয়িং মনে করেন, সরকার সঠিক পথেই আছে। তার মতে, নিষেধাজ্ঞা সমস্যাটাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। গত বছর এক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, 'যেসব দেশ ভেইপ বৈধ করেছে, সেখানে এর চাহিদা এবং তরুণদের মধ্যে ব্যবহার—দুটোই বিস্ফোরক হারে বেড়েছে। আর বৈধতা দিলেই যে অবৈধ কারবার বন্ধ হয়, তা নয়; বরং তা আরও বড় বাজার তৈরি করে।'
সিঙ্গাপুরের এই কঠোর অবস্থানের ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় যুক্তরাজ্যের মতো কিছু দেশে। সেখানে ভেইপিংকে সাধারণ সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর মনে করা হয়। এমনকি ধূমপান ছাড়তে মানুষকে ভেইপ ব্যবহারে উৎসাহিতও করা হয়।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) বলছে, ভেইপিং 'পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়' এবং অধূমপায়ী বা তরুণদের এটি ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে এটি সাধারণ ধূমপানের চেয়ে 'কম ক্ষতিকর' এবং ধূমপান ছাড়ার অন্যতম 'কার্যকর হাতিয়ার'।
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও গবেষক পিটার হায়েক মনে করেন, ভেইপিং নিষিদ্ধ করা জনস্বাস্থ্যের জন্য উল্টো ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি বলেন, 'নিকোটিন ছাড়তে যারা হিমশিম খাচ্ছেন, ভেইপ তাদের ক্যানসার বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এটা নিষিদ্ধ করার মানে হলো, কম ঝুঁকিপূর্ণ একটি পথ বন্ধ করে দিয়ে পরোক্ষভাবে সিগারেটের ব্যবসাই রক্ষা করা।'
ভেইপের ভেতরে মাদক মেশানোর আশঙ্কায় পুরো ভেইপ নিষিদ্ধ করার যুক্তি মানতে নারাজ অধ্যাপক পিটার। তিনি বলেন, 'কারও লাগেজে মাদক পাওয়া যেতে পারে—এই আশঙ্কায় তো আর কেউ সুটকেস নিষিদ্ধ করে না! তাই শুধু মাদকমিশ্রিত ভেইপ নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট।'
তবে বিশ্বজুড়ে ভেইপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন প্রায় ১০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের স্কুলগুলোতে ভেইপের ব্যবহার এত বেড়েছে যে শিক্ষকরা একে 'জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' হিসেবে ঘোষণা করতে সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ভেইপিং রক্তনালি ও ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি-ও বলছে, ই-সিগারেট পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
তবে সিঙ্গাপুর সরকার এসব তর্কে যেতে নারাজ। তাদের যুক্তি—ভেইপ পডে সিগারেটের চেয়েও বেশি মাত্রায় নিকোটিন থাকতে পারে, যা মানুষকে আরও বেশি আসক্ত করে তোলে। এ ছাড়া এতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক ও ভারী ধাতু থাকার ঝুঁকিও দেখছে তারা। যদিও ক্যানসার রিসার্চ ইউকের মতো সংস্থাগুলো বলছে, ভেইপে এসব রাসায়নিকের মাত্রা খুবই কম এবং এর কারণে ক্যানসার হওয়ার কোনো জোরালো প্রমাণ এখনো নেই।
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে কড়াকড়ি
সিঙ্গাপুরের মতো এতটা কঠোর না হলেও বিশ্বের অনেক দেশই এখন ভেইপিংয়ের লাগাম টানছে। অন্তত ৪৬টি দেশে ভেইপ বিক্রি নিষিদ্ধ এবং ৮২টি দেশে কোনো না কোনো বিধিনিষেধ রয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাছে ভেইপ বিক্রি নিষিদ্ধ ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন করছে। অস্ট্রেলিয়ায় ভেইপ কিনতে হলে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লাগে। বেলজিয়াম ডিসপোজিবল বা একবার ব্যবহারযোগ্য ভেইপ নিষিদ্ধ করেছে। মালয়েশিয়াও চলতি বছর সব ধরনের ভেইপ নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে।
মূলত তরুণদের রক্ষা করতেই এসব উদ্যোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত দেড় কোটি শিশু-কিশোর ই-সিগারেট ব্যবহার করে। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ভেইপ ব্যবহারের হার ৯ গুণ বেশি।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষক ইভেট ভ্যান ডার আইক সতর্ক করে বলেন, 'আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে এটি মহামারির আকার নেবে। সিগারেটের ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। সমস্যাটি অঙ্কুরেই বিনাশ করা না গেলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।' তার মতে, সিঙ্গাপুরের এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তটিই বিচক্ষণ।
সিঙ্গাপুর আয়তনে ছোট এবং দেশটির সরকার অত্যন্ত শক্তিশালী, তাই সেখানে এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের খুব কম দেশেই এমন পরিস্থিতি বিদ্যমান। এমনকি সিঙ্গাপুরও এই 'যুদ্ধ' কত দিন চালিয়ে যেতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
কড়াকড়ির মধ্যেও সিঙ্গাপুরের ভেইপ ব্যবহারকারীরা জানাচ্ছেন, তারা এখনো ভেইপ সংগ্রহ করতে পারছেন। আর খুব বেশি কড়াকড়ি হলে তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় চলে যান। ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন কর্মকর্তারা তো পর্যটকদের টানতে বাতাম দ্বীপকে 'ভেইপ উপভোগের বিকল্প স্থান' হিসেবেও প্রচার করছেন।
টোবি (ছদ্মনাম), যিনি ভেইপ ছেড়ে আবার সিগারেটে ফিরে যাচ্ছেন, তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের এই অভিযান ভেইপিংকে একটি 'বদভ্যাস' হিসেবে দেখছে।
টোবির ভাষায়, 'যেকোনো বদভ্যাস হলো তেলাপোকার মতো। আপনি একে মারার চেষ্টা করতে পারেন, আইন করতে পারেন—কিন্তু কখনোই পুরোপুরি নির্মূল করতে পারবেন না।'
